“কারো পৌষ মাস / কারো সর্বনাশ” — সৌতি বোস রায়
—- সৌতি বোস রায়
পৌষ যে উৎসবের মাস সেটা শহর বাংলায় হয়তো বোঝার উপায় নেই। কিন্তু রাঢ় বাংলায় গেলে তার হদিশ পাওয়া যায়।রাঢ়ভূমি মানব সভ্যতার আদিভূমি। কাঁসাই-শিলাইয়ের কূলে যেমন সৃজিত, লালিত মানব সভ্যতা পুরোপুরি কৃষি নির্ভর।পৌষ মাসের টুসু উৎসব কৃষি সংস্কৃতির ফসল।














কৃষকের ধানভরা খামারে। মানুষের সারা বছরের খাটুনি ক্ষণিকের বিশ্রাম উৎসবে মেতে ওঠে এই উৎসব। মাটি তাঁদের শ্রম সার্থকতা হিসেবে ফিরিয়ে দিয়েছে সোনার ফসল।
একাধিক দেবদেবী রয়েছে বাংলায়। বাংলা তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে লোক বিশ্বাস, লোক সংস্কৃতি জন্ম দিয়েছে না না দেবদেবীর। শাস্ত্রে উল্লেখ যেমন নেই, তাই পূজা-পালনে শাস্ত্রীয় নিয়ম কানুন নেই।
রাঢ় বাংলায় এমনি একান্ত নিজস্ব এক দেবী আছে । তিনি হলেন টুসু। পঞ্জিকা দেখে নির্ঘন্ট হয় না। পূজাতে নেই কোন নিয়মে কানুন। মানভূঞ, ধলভূঞ, সিংভূঞ অঞ্চলের মানুষদের আন্তরিক আবেগে পূজিত হয় তিনি।আঁউড়ি, চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, মকর, আখাইন সব কিছু কৃষিকেন্দ্রিকতা রীতি নীতি। ধর্মজীবনের উপর উর্বরতাবাদে কর্মজীবনের প্রভাব। চাষের শুরুতে মাটি- বীজ বপন, বর্ষার আগমনে মঙ্গল কামনায় গাঁয়ের আবাহন আবার চাষের সাময়িক বিরতিতে আশ্বিন ফুরাতে কার্তিক সামহাতে কৃষকের সাথী বাঁদনা-বর্দার পূজন! চাষীঘরে কাজের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ধর্মভাবনা। তাই পরবেরও কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতিরই ফসল। ধর্ম ও কর্ম এখন এক হয়ে গেছে।
অনার্য সভ্যতার কৃষি সংস্কৃতির দেবী টুসু।
অগ্রহায়ণে সোনালী ফসলে যখন উঠে খামারে, তখন চাষী তার ভরা খেতের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে কয়েকগাছি ধান আকাটা রেখা হয়। আঘন সাঁকরাইতের শুভদিনে মৌনব্রতী ভক্তের মাথায় চেপে ঠাকরাইন আসেন খামারে। আলপনা দেওয়া স্থানে অধিষ্ঠান করেন ডিনি ঠাকরাইন। চাষীবউ শুভঙ্করীর মৃৎপ্রদীপের আলোয় কঁচিকাঁচারা ছাড়িয়ে নেয় ধান্যশীর্ষ। মাটির সারুয়াকে বা মাটির পাত্রকে চাল গুঁড়ো মাখিয়ে, ধান ফেলে, তার উপর গোবর, দুর্বা ছড়িয়ে স্থাপন করা হয় টুসু দেবীকে। আঘন সাঁকরাইতে টুসু পাতানোর প্রাণাবেগ ভরা উৎসব কৃষি নির্ভর এই মানুষ মনে। মেয়েরা প্রতিদিন একটি করে ফুল অঞ্জলি দেয় টুসুদেবীর উদ্দেশ্যে- কোনোদিন গাঁদা, কোনোদিন আকন্দ আবার কোনোদিন বাসক! তুলসী পিঁঢ়ার পাশের দিরখায়, বা মাটির পাত্রে রোজ জমা হয় পুজোর ফুল! প্রতিদিন সন্ধ্যা মেয়েদের সমবেত কন্ঠে গেয়ে চলে,
“তিরিশ দিন রাখি মা’কে তিরিশটি ফুল দিয়ে গো;
আর রাখত লারব মা’কে, মকর আল্যো লজিকে।”
ভালোবাসায় লক্ষ্মীর আরাধনায় মেতে ওঠে চাষীর ঘরের মেয়েরা। তাদের আরাধ্য টুসুমণিকে ঘিরে কত কত গান বাঁধে তার হিসাব নেই। আমন ধানে টুসটুস্যে ভরে ওঠা উঠোনে টুসু যেন পূর্ণতার প্রতীক। লৌকিক দেবীকে ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত হাজারো উপকথা। তবে টুসুমণি দেবী হলেও টুসু মানব ও প্রকৃতির এক মিলিত বিগ্রহ, তাই ঘরের মেয়ে, আদরের মেয়ে ‘টুসু’। অনু সেখানে টুসু কখনো কন্যা, কখনো মাতা। একাধারে কন্যারূপে লালিতা ও মাতারূপে পালিকা। গ্রামের চাষী শ্রাবণে কচি ধান পরিচর্যায় স্নেহশীল পিতা, সারাবছর ভাতে রাখা ধান্যলক্ষ্মীর ছেলে মেয়ে। মানুষ ও প্রকৃতি, দেওয়া আর নেওয়া- চিরায়ত বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয় টুসু পরবেই।
তাই টুস নিয়ে লেখা হয় গান।
গ্রামে গ্রামে পাড়ায় পাড়ায়, কোথাও খালি গলায় পৌষালি রাতে পাড়ার মেয়ে, বউ’রা সুরের মূর্চ্ছনায় জাগিয়ে রুখামাটির দেশকে, শীতার্ত গ্রামকে করে তোলে গীতোষ্ণ। টুসু গীতের ছত্রে ছত্রে বিধৃত রয়েছে কতই না বেদনা বিধুর কাহিনী, সমকালীন সমাজচিত্র।
“তদের নকি ঠ্যাঙ ভাঙা টুসু,
তরহা দেখত্যে দে ন একটুকু…”
মকর সাঁকরাইত আসে পরের দিন। গানে গানে টুসু বিদায়। দেবী বিদায় বিসর্জন যেখানে। পুণ্যতোয়া জলের ছোঁয়ায় শস্যে নবাঙ্কুর আগমনের প্রতীক্ষা।
দূর্গা পূজা মত এসময় বাঙালি মায়ের মন, স্নেহের দুলালী টুসুকে শ্বশুরঘর পাঠানোর সময় গ্রাম্য মেয়ের চোখ ভেজে অশ্রুতে। গায় মন খারাপের গান-
“আমার বড়ো মনের বাসনা,
টুসুধনকে জলে দিব না”
ভূমি অঞ্চলের নদীঘাটে তখন বিটি-বিদায়ের আবেগঘন জলচিত্র-
“কাঁদছ্য কেনে সাধের টুসু,
বড় দাদার হাত ধর্যে;
ই সংসারে বিটি ছেল্যা,
রহে কি বাপের ঘরে!”
পৌষ পরবের শেষ দিন আখাইন। আদিবাসীদের নববর্ষ- আখাইন যাতরা। বছরের আরম্ভ বলেই হয়তো যাতরা, শুভক্ষণে পথ চলা।সূর্যের উত্তরায়নের সাথে তাল মিলিয়ে সরল মানুষের সহজিয়া পথে যাত্রা। এদিন সকালবেলা গৃহকর্তা নতুন যত-বেণি(জোয়াল বাঁধা দড়ি) সহযোগে সম্পন্ন করে আড়াই পাকের হালাচার, নেগ-নীতি, রীতি-রেওয়াজ মেনে “হাল-পুইহ্না”। দুপুরে দইচিড়ে ভোজনপূর্বে বসমাতার সমীপে নিবেদিত হয় চাষীজীবনের চিরায়ত প্রার্থনা- “আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।” বিকেল গড়াতেই চাপাইসিনি, দুয়ারসিনি, দেউলঘাটায় বসে বর্ষবরণের আনন্দমেলা! মেলায় ছো, ঝুমৈর, নাচনি, বুলবুলি, নাটুয়া, ঘোড়া নাচ, মোরগ লড়াই- গরীবগুর্বো মানুষগুলোর বছরভরের দুঃখ ভুলে থাকার মোচ্ছব।
কাকভোরে নদী থেকে স্নান সেরে সদ্য পাট ভাঙা কাপড়ে কচিকাঁচারা যখন আলপথ বেয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফেরে- এখনো মানভূঞা মনটা ছলাৎ করে ওঠে! পুকুর পাড়ে আগুন জ্বালিয়ে অশীতিপর বৃদ্ধ যখন মকর স্নানের প্রস্তুতি নেয়, ভাঙা গলায় তারস্বরে গেয়ে ওঠে-
“মজা মজা দমে মজা, পৌষ পরবে মজা রে,
বাঁউড়ি, মকর লটরপটর ঘুগনি আর মুড়ি;
খাপরা পিঠা, সীম ছেঁকা পেট ভরাভরি,
মজা মজা দমে মজা, পৌষ পরবে মজা রে…”


