বার্নপুরে ব্যবসায়ীকে শুটআউট, ধৃত তিন
বেঙ্গল মিরর, বার্নপুর ও আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* কাক ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে এক গ্রিল ব্যবসায়ীর উপরে সশস্ত্র দুষ্কৃতি হামলা ও গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো। শনিবার ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আসানসোলের হিরাপুর থানার বার্নপুরের করিম ডাঙ্গাল এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। জানা গেছে, অজ্ঞাতপরিচয় মোটরবাইক আরোহী এক দুষ্কৃতি ৪৬ বছর বয়সী এক গ্রিল দোকানদার মহঃ সরফুদ্দিনের উপর নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে হামলা চালায়। গুরুতর আহত দোকানদারকে তার পরিবারের সদস্যরা আসানসোল জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। গোটা ঘটনার খবর পেয়ে, আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশের এসিপি (হিরাপুর) ইপ্সিতা দত্তের নেতৃত্বে হিরাপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।














পুলিশ আধিকারিকরা মৃত দোকানদারের পরিবারের সদস্যদের কথা বলেন। ঘটনাস্থলে থাকা একটি সিসি ক্যামেরায় ঐ এলাকার বেশ কিছু ফুটেজ ধরা পড়েছে। তাতে একটি মোটরবাইক নিয়ে এক যুবককে ঐ ব্যবসায়ীর পেছনে যেতে দেখা যাচ্ছে। বেশ কিছুটা যাওয়ার পরে ঐ একটা শব্দ পাওয়া যায় ও দেখা যায় ঐ ব্যবসায়ী রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে আছেন। পুলিশ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। এদিন দুপুরে আসানসোল জেলা হাসপাতালে ঐ ব্যবসায়ীর মৃতদেহর ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। সেই ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গেছে, পেছনের দিক থেকে দুষ্কৃতি পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ বা খুব কাছ থেকে ঐ ব্যবসায়ীর পিঠের ডানদিকে গুলি চালায়। সেই গুলি সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। এছাড়াও ঐ ব্যবসায়ীর মুখে ও নাকে ক্ষত চিহ্ন রয়েছে।
পুলিশের অনুমান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরে পড়ে যাওয়ার কারণেই ঐ ক্ষত চিহ্ন হয়েছে। এদিকে, এই ঘটনা নিয়ে বার্নপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি বলেন, এটা বর্তমান বাংলার পরিস্থিতিতে নতুন কোনকিছু নয়। গোটা বাংলার আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। কোন মানুষের নিরাপত্তা যে নেই, এদিনের বার্নপুরের ঘটনা তার প্রমান। একজন মানুষ রাস্তা দিয়ে নামাজ পড়তে যাচ্ছেন, তখন তাকে গুলি করে খুন করে দেওয়া হলো। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের শাসনে বাংলায় এখন দুষ্কৃতিরাজ চলছে।যদিও, বিজেপি বিধায়কের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসে।
আসানসোল দক্ষিণ ব্লক ( শহর) তৃনমুল কংগ্রেসের সভাপতি পূর্ণেন্দু চৌধুরী ওরফে টিপু বলেন, এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বার্নপুর এখন অনেক শান্ত। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। আশা করি, পুলিশ দ্রুত তদন্ত করে এই ঘটনার কিনারা করবো ও দোষীদের গ্রেফতার করবে। তিনি বিজেপি বিধায়ককে পাল্টা আক্রমণ করে বলেন, তার দলের চালানো অন্য রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা কোন জায়গায় আছে, সেটা তিনি কি জানেন?পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হিরাপুর থানার বার্নপুরের করিম ডাঙ্গালের বাসিন্দা মহঃ সরফুদ্দিন শনিবার ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্থানীয় মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছিলেন।
সেই সময় রাস্তায় সরফুদ্দিনের কাছে মোটরবাইকে করে এক দুষ্কৃতি আসে। সরফুদ্দিন কিছু বুঝে উঠার আগেই দুষ্কৃতি তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তাতে তিনি মাটিতে পড়ে যান ও তার নাকে গুরুতর আঘাত লাগে। গুলি চালানোর পরে দুষ্কৃতি ঘটনাস্থলেই তাদের পিস্তল ফেলে পালিয়ে যায়। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা গুরুতর আহত সরফুদ্দিনকে আসানসোল জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। যেখানে চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই খবর পেয়ে এসিপি ইপ্সিতা দত্ত এবং সিআই অশোক সিং মহাপাত্র ও হিরাপুর থানার ওসি তন্ময় রায়ের নেতৃত্বে হিরাপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্ত করতে পৌঁছায়। মৃতের ভাই মহঃ জয়নুল বলেন, আমার দাদার সরফুদ্দিনের একটি গ্রিল এবং রডের ব্যবসা আছে। কারোর সাথে তার কোনও শত্রুতা ছিল না। এদিন ভোরবেলা একটি মোটরবাইক করে অজ্ঞাত দুষ্কৃতি এসে তাকে গুলি করে। এলাকার বাসিন্দারাও কেউ বুঝতে পারছেন না যে কি করে এই ঘটনা ঘটেছে। কারণ সরফুদ্দিনের কারোর সাথে কোনও বিবাদ ছিলো না বলে দাবি তাদের।মৃত ব্যবসায়ীরা পাঁচ ভাই। এই ঘটনা নিয়ে মৃতের ভাইপো মহঃ সানু জানিয়েছেন যে, তার মা তাকে ঘুম থেকে তুলে, বলেন যে তার কাকা সরফুদ্দিনের উপর আক্রমণ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা লোকেরা কেবল দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চাচা নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং কাছেই একটি বন্দুক পড়ে ছিল। মহঃ সানু আরো জানিয়েছেন যে, পরিবারের সদস্যরা সরফুদ্দিনকে আসানসোল জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। কাকাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে । ভোরের এই ঘটনায় গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল এবং একটি গুলির খোল উদ্ধার করেছে।শনিবার সন্ধ্যায় হিরাপুর থানায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশের ডিসিপি ( পশ্চিম) সানা আখতার বলেন, এই খুনের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতরা হলো মহঃ সালাম, মহঃ সাদ্দাম ও রবীন্দর সিং। তিনজনের মধ্যে মহঃ সালাম ও মহঃ সাদ্দাম সম্পর্কে মৃত ব্যক্তির বড় ভাইয়ের দুই ছেলে অর্থাৎ ভাইপো। অন্যজন তাদের পরিচিত। তিনি আরো বলেন, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তার বড়ভাইয়ের পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে একটা বিবাদ চলছিলো। ধৃত দুই ভাইপো স্বীকার করেছে যে, তারা এই ঘটনা পরিকল্পনা করে ঘটিয়েছে। ঘটনাস্থল বা পিও ঘিরে দেওয়া হয়েছে। এফএসএল টিমকে ডাকা হয়েছে। তারা এসে তথ্য প্রমাণা সংগ্রহ করবে। ধৃতদেরকে রবিবার আসানসোল আদালতে পেশ করে হেফাজতে নেওয়া হবে। তারপরে তাদেরকে জেরা করে আর কেউ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে কিনা তা খুঁজে বার করা হবে। তবে, সিসিটিভির ফুটেজে যে মোটরবাইক সওয়ার যুবককে ঐ ব্যবসায়ীকে পিছু ধাওয়া করে যেতে দেখা গেছে, তা ধৃতদের মধ্যে আছে কিনা, তা এদিন স্পষ্ট করে ডিসিপি জানাননি।


