কয়লা পাচার মামলায় এবার সিবিআইয়ের “প্রভাবশালী” তত্ত্ব,কেন্দ্রীয় এজেন্সির অতি সক্রিয়তা নিয়ে কটাক্ষ শাসকের, মাথাটা কে, জানতে চায় বাংলার মানুষ, দাবি বিজেপির
বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* শিক্ষা, রেশন দূর্নীতির পরে এবার বহুচর্চিত কয়লা পাচার মামলায় এবার সিবিআইয়ের ” প্রভাবশালী ” তত্ত্ব! আসানসোল সিবিআই আদালতে চলা এই মামলার শেষ শুনানিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সির অফিসার বলেছেন, আগামী তিন মাসের প্রভাবশালীদের নাম জানানো হবে। স্বাভাবিক ভাবেই, সিবিআইয়ের এই দাবিতে বঙ্গ রাজনীতিতে শোরগোল পড়েছে। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই দাবির পেছনে ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনীতির যোগ দেখছে। অন্যদিকে, রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি চাইছে, প্রভাবশালী নয়, বড় মাথার খোঁজ দিতে হবে সিবিআইকে। তবে, এই মামলার অভিযুক্তদের অন্যতম আইনজীবী কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তের ধরন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার কয়লা পাচারে কি ধরনের ভূমিকা ছিল প্রভাবশালীদের ?














কয়লা পাচারের কিংপিন বা মাষ্টার মাইন্ড অনুপ মাজি ওরফে লালার সঙ্গে কোন কোন প্রভাবশালীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ? তারা ঠিক কি কি সুবিধা পেয়েছিলেন কয়লা কারবারিদের কাছ থেকে ? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে আগামী তিন মাসের মধ্যেই। গত সপ্তাহের শেষে আসানসোল সিবিআই আদালতে শেষ শুনানিতে বিচারকের প্রশ্নের জবাবে এমনই বলেছেন এই মামলার আইও বা তদন্তকারী অফিসার ।প্রসঙ্গতঃ, ইতিমধ্যেই এই মামলায় একাধিক তথ্য আদালতের সামনে এনেছে সিবিআই। ২০২৪ সালের ৩০ জুন এই মামলার শেষ চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছে সিবিআই।
এর আগে ১২ জন ইসিএলের উচ্চপদস্থ আধিকারিক গ্রেফতার হয়েছেন এই মামলায়। এবার সেই আধিকারিককে নিয়ে নানা মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। চোরাই কয়লা কেনার জন্য আগেই ১০টি সংস্থার নাম সিবিআই তাদের চার্জশিটে দিয়েছে। আগের দিনের শুনানিতে এই মামলার তদন্তকারী অফিসারকে কেস ডায়েরি বা সিডি নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বিচারক অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়।সেই মতো তদন্তকারী অফিসার তা নিয়ে আসেন। আসানসোলের সিবিআই বিশেষ আদালতের বিচারক অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় সেই কেস ডায়েরি দেখে বলেছিলেন, এই মামলায় চার ধরনের অভিযুক্ত রয়েছে। প্রথমেই রয়েছে, কয়লাখনির সরকারি আধিকারিকরা। যারা কয়লা চুরি করতে সাহায্য করেছেন। দ্বিতীয়, যারা কয়লা চুরি করেছেন। তৃতীয় , যারা চোরাই কয়লা কিনেছেন। চতুর্থ, প্রভাবশালী। যারা গোটা চক্রটি চালাতে সাহায্য করেছেন। প্রথম তিনে থাকা অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়েছে। বিচারকের প্রশ্ন ছিলো, এই মামলায় প্রভাবশালীদের বিষয়টা কি ? তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কি চলতেই থাকবে ? শুনানিতে সিবিআইয়ের তদন্তকারী অফিসার উমেশ কুমারের কাছে বিচারক জানতে চান, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে তদন্ত কবে শেষ হবে? তখন তদন্তকারী অফিসার বলেন, তিন মাসের মধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করা হবে। আর এখানেই কয়লা পাচার মামলা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক।
এই প্রসঙ্গে আসানসোলে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অশোক রুদ্র বলেন, এই মামলায় প্রভাবশালী কে, তা তো বিচারক দেখবেন। আমার তো তা জানা নেই। যেটা আমাদের জানা তা হলো, আর কয়েক মাস পরে বাংলায় বিধানসভা ভোট। তাই ইডি, সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সির অতি সক্রিয়তা আমরা ও বাংলার মানুষেরা দেখতে পাবেন। তার দাবি, এর আগে এটা নিয়ে তো তিনটে নির্বাচন হয়েছে। কিছুই হয়না। তখন অতি সক্রিয় হয়। তারপর স্বাভাবিক হয়ে যায়। তিনি বলেন, প্রভাবশালী বলতে কাদরকে বলা হয়েছে, সেটা দেখতে হবে। শুধু তো রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীরা প্রভাবশালী নয়। বিজেপির অনেক রাজ্যে দুর্নীতি হয়েছে। আমরা দুর্নীতিকে প্রশয় দিইনা। সিবিআই রাজনৈতিক পক্ষপাত দুষ্ট না হয়ে যদি, তদন্ত করে প্রভাবশালী বার করে তো বেরোবো, কারা করছে, না করছে। অন্যদিকে, আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, এই কোটি কোটি টাকার কয়লা কারবারে আদালত তিন ধরনের ব্যক্তিদেরকে আইডেন্টিফাই করছে। কিন্তু এই সব কিছুর মধ্যে একটা প্রভাবশালী ব্যক্তি আছে। বিচারক এখানেই জানতে চেয়েছেন, সেই প্রভাবশালী ব্যক্তি কে? আইও বলেছেন, আমরা তিন মাসের মধ্যে জানাবো।
বিজেপি বিধায়ক বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সেই প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের নামগুলো চাই। শিক্ষা দুর্নীতি, রেশন চুরি হচ্ছে। সেখানেও ঐ প্রভাবশালীর নাম আছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ জানতে চান সেই ব্যক্তি কে? যার ইন্সস্ট্রাকশানে এইসব কিছু হয়েছে। এদিন এই কয়লা পাচার মামলার অভিযুক্তের আইনজীবী শেখর কুণ্ডু সিবিআই তদন্ত নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অসম্পূর্ণ চার্জশিট সিবিআই আদালতে পেশ করেছে। যাদের বিরুদ্ধে এই মামলায় ট্রায়াল চলছে, সিবিআই ফের তাদের ডেকে পাঠাচ্ছে। আমরা পিটিশন করে বলেছিলাম যে, সাক্ষ্যদান শুরু হয়েছে। এটা আইনতঃ ঠিক নয়, যে আবার ডাকবে। আমরা তিনটে কাগজ দেখাই। এর ফলপ্রসূতিতে আইওকে ডাকা হয়। তিনি আরো বলেন, এই মামলার কতগুলো পার্ট আছে। প্রথমে ইসিএলের আধিকারিক। যেখান থেকে কয়লা গেছে। সবার শেষে রয়েছে কয়লা একটা ম্যানুফেকচারিং ইউনিটে দেয় এমন একটা গ্রুপ আছে। এই গোটা গ্রুপ নিয়ে এই মামলা। এই অবস্থায় সিবিআই বলে, একটা কোম্পানি আছে। যাকে আমরা ধরতে পারছিনা। তখন বিচারক বলেন, কোম্পানি হলে হবে না। ব্যক্তিগতভাবে তাকে ডাকতে হবে। আইনজীবী বলেন, চার্জশিট যখন হয়েছে। তখন যেই থাকুন না তিনি জামিন পেয়ে যাবেন। শেখরবাবু বলেন, তদন্তের ক্ষেত্রে সিবিআই খুবই মন্থর। রাজ্য পুলিশ ও সিবিআইয়ের তদন্তের মধ্যে, সিবিআইয়ের তদন্তে আমাদের ধারণা খুব খারাপ। এটা কতদিন চলতে পারে, তা আমরা বলতে পারনো না। যদি মনে করে, কাউকে ভোগাবো, তখন তাকে ডাকবে। সরকার যারা পরিচালনা করে, তারা এটাকে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, এই মামলার পরবর্তী শুনানি ১৭ ডিসেম্বর হবে বলে বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন।


