ASANSOL-BURNPUR

আসানসোল আদালতে সাজা ঘোষণা, নাবালক খুনে দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* দুবছর আগে ১৪ বছরের এক নাবালক খুনের ঘটনায় শুক্রবার দোষী সাব্যস্ত দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো। এদিন আসানসোল আদালতের ফাস্ট ট্র্যাক ফাস্ট কোর্টের বিচারক জয়তী সাহা বিট্টু মন্ডল ও উদয় মন্ডল নামে এই দুজনের সাজা ঘোষণা করেন। গত বুধবার তথ্য প্রমাণাদি ও সাক্ষ্য দানের এই দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। বিট্টু মণ্ডলের সম্পর্কে মামা হয় উদয় মণ্ডল। এই উদয় মন্ডল বিহারের বাসিন্দা। সে বিহারের কুখ্যাত অপরাধী। তার নামে বিহারে একাধিক অপরাধের মামলা আছে। বিট্টু মণ্ডলের ভাইও এই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত। সে নাবালক হওয়ার তার বিচার জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডে হচ্ছে। বিট্টু মন্ডলের ভাই খুন হওয়া নাবালকের বন্ধু।

এই মামলার সরকারি আইনজীবী বা পিপি হিসেবে ছিলেন সোমনাথ চট্টরাজ। এদিন তিনি বলেন, এই মামলায় ৩৮ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সাক্ষী দিয়েছেন দোষী সাব্যস্ত বিট্টু বান্ধবীও। এই বান্ধবী অন্ডালের বাসিন্দা। খুন হওয়া নাবালকের হাতে বেশ কয়েকটি চুল আটকে ছিল। আসানসোল জেলা হাসপাতালে নাবালকের দেহের ময়নাতদন্তের সময়ে চিকিৎসক বিষয়টি লক্ষ্য করেন। এটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আদালতে পেশ করা হয়েছিলো। ঐ চুলের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছিলো। সেই পরীক্ষার রিপোর্ট দোষী সাব্যস্ত বিট্টু মন্ডলের চুলের ডিএনএ পরীক্ষার সঙ্গে মিলে যায়। এছাড়াও মৃত নাবালকের মোবাইল ও বিট্টু মন্ডলের মোবাইলের তথ্যও অভিযুক্তদের আদালতে দোষী সাব্যস্ত করতে অনেকটাই সুবিধা করে। বিচারক বুধবার দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন।

এদিন বিচারক এই চূড়ান্ত মামলার রায়দান করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ আসানসোলের হিরাপুর থানার বার্নপুরের রামবাঁধে নিজের বাড়ির সামনে মোবাইলে গেম খেলছিলো দুই ভাই। বড় ভাই শৌচালয় যায়। পরে সে ফিরে এসে দেখে ছোট ভাই নেই। স্বাভাবিক ভাবেই তার খোঁজ শুরু হয়। বেশ কিছুক্ষন পরে এলাকার এক বাসিন্দা পরিবারের সদস্যদেরকে জানায়, শ্যামবাঁধের এক বন্ধুর সঙ্গে সে দামোদর ঘুরতে গেছে। কিন্তু এরপর ঐ নাবালক আর বাড়ি ফিরে আসেনি। পরের দিন ২৭ মার্চ নাবালকের পরিবারের তরফে হিরাপুর থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ এফআইআর করে তদন্ত শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ২৮ মার্চ হিরাপুর থানার দামোদর নদী লাগোয়া একটা জলা জায়গা থেকে এক নাবালকের বস্তাবস্তি মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সেই দেহ ঐ নাবালকের পরিবারের সদস্য সনাক্ত করেন।

তদন্তে নেমে হিরাপুর থানার পুলিশ জানতে পারে , খুন নাবালকের নিজেরই বন্ধু তাকে ঘোরানোর নাম করে দামোদর নদীর কাছে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল নাবালক বন্ধুর বড় দাদা বিট্টু মন্ডল ও তার মামা উদয় মন্ডল। তারাই আগে থেকে পরিকল্পনা করে ১৪ বছরের নাবালককে অপহরণ করে ঐ নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। নাবালকের মুখে সেলোটেপ বেঁধে দেয় তারা। এরপর নাবালকের মোবাইলে তার ছবি তোলে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের লোকদেরকে সেই ছবি পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায় করা। কিন্তু তাদের এই কাণ্ড করার সময়ে সন্দেহ হয় যে, কেউ তা দেখেছে। তারা ফেঁসে যেতে পারে। এরপরই তারা নিজেদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে দেয়। তারা নাবাললকে খুন করে সেই দেহ একটা বস্তায় ঢুকিয়ে দামোদর নদীর পাশে একটা জলা জায়গায় দেহ ফেলে দেয়। নিজেদের কুকীর্তি কেউ যাতে বুঝতে না পারে, তার জন্য প্রমাণ লোপাট করতেও সব রকম চেষ্টা করেছিল তারা। যেমন তারা ঐ নাবালকের ফোন ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আসানসোল রেল স্টেশনের ৭ নং প্ল্যাটফর্মে ফেলে দিয়ে এসেছিলো। যাতে প্রমাণ করা যায়, অন্য কেউ বা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। হিরাপুর থানার পুলিশ তিনজনকেই ধরে। তাদের বিরুদ্ধে হিরাপুর থানার পুলিশ অপহরণ, খুন, অপরাধমুলক যড়যন্ত্র ও তথ্য প্রমাণ লোপাটের ধারায় মামলা করে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই মামলার আইও বা তদন্তকারী অফিসার চার্জশিট জমা দেন আদালতে।

আরো জানা যায়, বিট্টু অন্ডালের বাসিন্দা নিজের বান্ধবীকে ঘটনার আগের দিন বলেছিলো যে, তাকে ধনী বা বড়লোক হতে হবে। সে একজনের অপহরণ করবো ও তার পরিবারের কাছ থেকে সে মুক্তিপণ আদায় করবে। এমনকি বিট্টু ঘটনা ঘটানোর পরে পুরো বিষয়টি নিজের বান্ধবীকে জানায়। আদালতে সেই বান্ধবী সাক্ষ্যদান করতে এসে সব কথা জানান। জানা যায়, সাজাপ্রাপ্ত উদয় মণ্ডল বিহারের ভাগলপুরের কুখ্যাত অপরাধী। দুই ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে সে এই অপরাধের ব্লু প্রিন্ট করে ও পুরো নেতৃত্ব দেয়।বিচারক দুজনকে অপহরণ, খুন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও তথ্য প্রমাণ লোপাটের চারটি ধারাতেই দোষী সাব্যস্ত করে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন।

News Editor

Mr. Chandan | Senior News Editor Profile Mr. Chandan is a highly respected and seasoned Senior News Editor who brings over two decades (20+ years) of distinguished experience in the print media industry to the Bengal Mirror team. His extensive expertise is instrumental in upholding our commitment to quality, accuracy, and the #ThinkPositive journalistic standard.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *