এসআইআর আতঙ্ক এবার সালানপুরে, শুনানির আগেই বাড়িতে আত্মঘাতি বৃদ্ধ, এলাকায় চাঞ্চল্য
বেঙ্গল মিরর, সালানপুর ও আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* এবার এসআইআর আতঙ্ক পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলের সালানপুর ব্লকে।শুনানিতে যাওয়ার আগেই এসআইআরের বাড়িতে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতি হলেন ৭২ বছরের এক বৃদ্ধ। ঘটনাটি ঘটেছে রবিবার সকালে সালানপুর থানার হিন্দুস্তান কেবল সংলগ্ন অরবিন্দ নগরের ৭ নং রাস্তায়।পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৃত বৃদ্ধর নাম নারায়ণ চন্দ্র সেনগুপ্ত। তিনি ও তার ছোট মেয়ে সঞ্চয়িতা দাস সেনগুপ্তর খসড়া ভোটার তালিকায় নাম ছিল না। যে কারণে তারা ডাক পেয়েছিলেন শুনানিতে। কিন্তু সেই শুনানিতে মাধ্যমিকের এ্যাডমিট কার্ড নেওয়া হচ্ছে না। পিএফ ও পেনশন বুকও যথাযথ নথি নয়। এইসব নানান সমস্যার মাঝে পড়ে ভয়ংকর মানসিক অবসাদের সঙ্গে চাপ অনুভব করছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে ঐ বৃদ্ধ নিজের বাড়িতেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলেন বলে তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয় পরিজনদের।














সোমবার সকালে আসানসোল জেলা হাসপাতালে বৃদ্ধর মৃতদেহর ময়নাতদন্ত করা হবে বলে পুলিশ সূত্রে বলা হয়েছে। এদিকে, এই ঘটনার পরে স্বাভাবিক ভাবেই কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে ( ইসিআই) আক্রমণ করেছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। এই ঘটনা নিয়ে অবশ্য বিজেপির কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি। জানা গেছে, বারাবনি বিধানসভার সালানপুর ব্লকের হিন্দুস্তান কেবলস সংলগ্ন অরবিন্দ নগরের ৭ নম্বর রাস্তায় চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানার প্রাক্তন কর্মী নারায়ণ চন্দ্র সেনগুপ্ত পরিবার নিয়ে দীর্ঘকাল বাস করছেন। তার তিন মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে সংসার। তিন মেয়েই বিবাহিতা।
কিন্তু এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়া শুরুর পরে নারায়ণ বাবু জানতে পারেন তার এবং ছোট মেয়ে খসড়া ভোটার তালিকায় নাম নেই। বিষয়টি নিয়ে তিনি যথেষ্ট চাপে পড়ে গেছিলেন বলে পরিবারের সদস্য ও এলাকার বাসিন্দা বন্ধুরা জানান। প্রায়ই এই বিষয়টি তিনি তাদের কাছে উল্লেখ করতেন। শেষ পর্যন্ত তার ও ছোট মেয়ের কি হবে তাই নিয়ে তিনি খুব চিন্তায় থাকছিলেন। এলাকার বুথ লেভেল অফিসার ও বিএলও শান্তনু দাসকেও তিনি শুনানিতে ডাক পাওয়ার বিষয় ও নথি সংক্রান্ত সমস্যার বলেছিলেন। তখন শান্তনুবাবু তাকে সম্পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি নারায়ণবাবুকে বলেছিলেন, আমি বিএলও হিসেবে শুনানির সময় থাকবেন কোন অসুবিধা হবে না। এদিকে, চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানার অবসর নেওয়া তার পুরনো সহকর্মীদের কাছেও সান্ধ্য আড্ডায় এই বিষয়টি নিয়ে তিনি একাধিকবার আলোচনা করেছেন।
যদি তার কাছে থাকা তথ্য নির্বাচন কমিশন মেনে না নেয়, তাহলে তার এবং ছোট মেয়ের কি হবে সেই নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন। নারায়ণবাবুর প্রতিবেশী সমাজকর্মী প্রিন্স দাস বলেন, দিন তিনেক ধরেই নারায়ণ বাবু অত্যন্ত চুপচাপ থাকছিলেন। এদিন সকালে তিনি পাড়ার সেলুনে দাড়ি কেটেছেন। তারপর সকালে বাজারেও যান। বাজার থেকে বাড়ি ফিরে স্ত্রী এবং ছোট মেয়ের হাতে বাজারের ব্যাগ দিয়ে দোতলায় চলে যান। দোতলার ঘরে নারায়ণবাবু বিছানার চাদর দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে সিলিং ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলে পড়েন। পরে তার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে দোতলায় গিয়ে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকেরা ছুটে আসেন। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে আসানসোল জেলা হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
স্বাভাবিক ভাবেই নারায়ণবাবুর এই মর্মান্তিক পরিণতি স্থানীয় বাসিন্দারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। যদিও সকলেই তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, শুনানিতে বহু মানুষ ডাক পেয়েছেন। সেই রকম তিনিও পেয়েছেন এতে অসুবিধার কিছু নেই। কিন্তু এই চাপ সহ্য করা তার কাছে মুশকিলের হয়ে উঠেছিল বলে তারা মনে করছেন। এদিকে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার ভিত্তিতে এসআইআর প্রক্রিয়ার জন্য যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে নারায়ণ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও তার ছোট মেয়ে সঞ্চয়িতা দাস সেনগুপ্তের নাম নেই।সালানপুরের এই ঘটনা নানান রকম বিভ্রান্তিমূলক প্রচার এবং নির্বাচন কমিশনের ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন ও শুনানিতে তথ্য হিসেবে জমা দেওয়া নথি পরিবর্তনই দায়ী বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। নারায়ণবাবুর এই পরিণতিতে তার অসুস্থ স্ত্রী বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। বাবার মৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে গেছেন তার ছোট মেয়ে।এসআইআরের জন্য নারায়ণ চন্দ্র সেনগুপ্তর আত্মহত্যার ঘটনায় সরাসরি বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা বারাবনির বিধায়ক বিধায়ক বিধান উপাধ্যায়। এদিন তিনি বলেন, খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এরজন্য দায়ী বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকায় সংশোধন সঠিক ভাবে করতে তো সময় দেওয়া উচিত ছিলো। যা প্রথম থেকেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায় বলে আসছেন। তিনি আরো বলেন, বিজেপির কথায় নির্বাচন কমিশন বাংলার মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশ জানায়, এক বৃদ্ধর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তার ও ছোট মেয়ের খসড়া ভোটার তালিকায় নাম ছিলো না বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। পরিবারের তরফে কোন অভিযোগ এখনো দায়ের করা হয়নি। সালানপুর ব্লক প্রশাসনের তরফে বলা হয়েছে, ঠিক কি ঘটনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।







