কয়লা পাচার মামলা : অভিযানের ৬ দিনের মাথায় বুদবুদ থানার ওসিকে তলব ইডির, ডাকা হলো লালা ঘনিষ্ঠকেও
বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* অভিযানের ঠিক ৬ দিনের মাথায় সোমবার কয়লা পাচার মামলায় তলব করা হলো আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের বুদবুদ থানার ওসি মনোরঞ্জন মন্ডলকে। একইভাবে কেন্দ্রীয় এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি কলকাতায় সিজিও কমপ্লেক্সে ডেকে পাঠায় অনুপ মাজি ওরফে লালা ঘনিষ্ঠ চিন্ময় মন্ডলকেও। এদিন সকালে দুজন কলকাতায় ইডির অফিসে যান। প্রসঙ্গতঃ, গত ৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সাতসকালেই বাংলার একাধিক জায়গায় অভিযানে চালায় ইডি। কয়লা পাচার মামলায় দুর্গাপুর, আসানসোল, বর্ধমান, দিল্লি সহ ৯টি জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছিলো ।















সূত্রের খবর, কয়লা পাচারের কালো টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে কোনপথে কার কার কাছে গেছে, তার খোঁজেই এই অভিযান ইডির।এছাড়াও কয়লা পাচারে প্রোটেকশন মানি কারা নিতো, কার মাধ্যমে তা হতো সেই বিষয়ের খোঁজেও সক্রিয় হয়েছে ইডি। সেদিনের অভিযানে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির আধিকারিকদের সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। অভিযান চলে পান্ডবেশ্বরের কয়লা ব্যবসায়ী শেখ মইদুল, জামুড়িয়ায় ব্যবসায়ী রাজেশ বনশল, কাঁকসার হাসিম মির্জা রেজা ও রানিগঞ্জের কিরন খানের বাড়িতে। ইডি সূত্রের খবর জামুড়িয়ায় রাজেশ বনশলের বাড়ি থেকে প্রায় ১ কোটি টাকার মতো নগদ টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া গেছিলো বলে ইডি সূত্রে জানা যায়।
ঐ ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে তিনটি হলুদ রঙের বস্তা হাতে দুজন ইডির আধিকারিক বেরোন। তাদের পাহারা দিয়ে ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যান কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। দাবি করা হয়েছে, ঐ তিনটি বস্তার ভেতরেই ছিলো উদ্ধার হওয়া টাকা ও নথি। এর আগে এসবিআইয়ের তিনজনকে দেখা যায়, এই হলুদ রঙের বস্তা নিয়ে ব্যবসায়ীর বাড়িতে ঢুকতে। পরে জানা যায়, তাতে টাকা গোনার মেশিন রয়েছে। সেদিন সদ্য বুদবুদ থানার ওসির দায়িত্ব পাওয়া মনোরঞ্জন মণ্ডলের দুর্গাপুরের অম্বুজানগরীর বাড়িতে হানা দিয়েছিলেন ইডি আধিকারিকরা। কয়েকদিন আগেই বুদবুদ থানায় পোস্টিং পেয়েছেন মনোরঞ্জন মণ্ডল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন ইডি আধিকারিকরা বলে জানা যায়। প্রায় ১২ ঘন্টা ওসির বাড়িতে ইডির আধিকারিকরা ছিলেন। তবে ওসির বাড়ি থেকে কি কি পাওয়া গেছে, তা জানা যায় নি। উল্লেখ্য, এই মনোরঞ্জন মন্ডলকে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বারাবনি থানার ওসি পদে থাকাকালীন তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছিলো। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছিলো। এরপরে, তাকে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের এসবি বা স্পেশাল ব্রাঞ্চকে এসআই পদে আনা হয়েছিলো। সেখান থেকে তাকে দিন কয়েক আগেই বুদবুদ থানার ওসি করা হয়।
এই মনোরঞ্জন মন্ডলের সঙ্গে শাসক দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে অভিযোগ। বারাবনি থানার ওসি থাকাকালীন ওসির চেম্বারে বারাবনির এক শাসক দলের নেতার জন্মদিন পালন করে তিনি বিতর্কে জড়ান। এছাড়া, সেদিন দুর্গাপুরে সেপকো টাউনশিপে বালি কারবারি প্রবীর দত্তর বাড়িতেও হানা দিয়েছিলেন ইডির আধিকারিকরা। সিটি সেন্টার অঞ্চলে অম্বেদকর সরণিতে একটি বাড়িতেও হানা দেয় ইডির আধিকারিকদের একটি দল।এর পাশাপাশি পান্ডবেশ্বর ও কাঁকসা থানার ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কের দুই ব্যবসায়ীর বাড়িতে আসেন ইডির আধিকারিকরা। দুজনের মধ্যে এক ব্যবসায়ী অজয় ও দামোদর নদী থেকে বালি উত্তোলন করে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করে। সরকারি নিয়ম মেনে টেন্ডারে অংশ নিয়ে বৈধ বালি ঘাট থেকে বালি তোলার পাশাপাশি অভিযোগ একাধিক জায়গায় অবৈধ ভাবে বালি উত্তোলন করে পাচার করা হতো বলে অভিযোগ। এছাড়া বালির চালান জালিয়াতি করার অভিযোগ উঠেছে এইসব বালি কারবারিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বীরভূমের বালির চালান দিয়ে পশ্চিম বর্ধমান জেলায় বালি পাচার করত। এছাড়া একটা চালান দিয়ে একাধিকবার বালি পাচারের করত বলে অভিযোগ। এই ভাবে এইসব বালির কারবারিরা প্রচুর সম্পত্তি করেছে বলে অভিযোগ।একই সঙ্গে, সেদিন সকালে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির আধিকারিকরা আসানসোলের জামুরিয়া ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলা এলাকার সাবান ফ্যাক্টরি লেনে হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী রাজেশ বনশলের বাড়িতে অভিযান করেন। সিআইএসএফকে ১৩ সদস্যের একটি ইডি আধিকারিকদের একটি দল ঐ ব্যবসায়ীর বাড়ির ভেতরে তল্লাশি চালালো শুরু করে। খবর অনুসারে, রাজেশ বনশল জামুরিয়া এলাকায় হার্ডওয়্যার ব্যবসার সাথে জড়িত এবং রানিগঞ্জ এলাকায় তার একটি হার্ডওয়্যার ব্যবসাও রয়েছে। কয়লা সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যকলাপে তার আগে থেকে এই ব্যবসায়ী জড়িত আছে কিনা তা তদন্ত করছে ইডি। তার নামে অবৈধ এবং হিসাব বহির্ভূত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তদন্ত করছে।
প্রায় ১২ ঘন্টা অভিযান শেষ করে এদিন বিকেল পাঁচটা নাগাদ ইডির আধিকারিকরা জামুড়িয়ার ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।তবে, ইডির এই অভিযানকে কেন্দ্র করে বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপানওতোর শুরু হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছে বিজেপি। যদিও, শাসক দল পাল্টা কয়লা মাফিয়ার সঙ্গে বিজেপির যোগাযোগ নিয়ে তোপ দেগেছে।ইডি সূত্রে জানা যায়, ৩ ফেব্রুয়ারির অভিযানে পাওয়া তথ্য প্রমাণাদি যাচাই করতে এদিন এই দুজনকে ডাকা হয়েছে।

