পশ্চিম বর্ধমানের সালানপুরে ৩০ শে জুন সরকারিভাবে পালিত হলো আদিবাসীদের “হুল উৎসব”; উপস্থিত ছিলেন জেলাশাসক, বিধায়ক, প্রজেক্ট অফিসার, আসানসোল মহকুমাশাসক, বিডিও এবং অন্যান্য

আসানসোল, ৩০ শে জুন,২০২০, বেঙ্গল মিরর, সৌরদীপ্ত সেনগুপ্ত :
ইতিহাস বলে সাঁওতালরা এ দেশের ভুমিপুত্র। তাদের নিজস্ব কোন বসতি ছিলনা । ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত আন্দোলন ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন দুই মহান নেতা সিধু ও কানু এবং পরে তারা শহীদ হন।

riju advt

এই মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হুল দিবস পালিত হয়।
কিন্তু এবারে সারা ভারতবর্ষে সার্বিক পরিস্থিতি একদমই আলাদা। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পশ্চিম বর্ধমানের সালানপুরে রাজ্য সরকারের আদিবাসী কল্যাণ দপ্তর এবং সালানপুর পঞ্চায়েত সমিতির উদ্যোগে মঙ্গলবার ৩০ শে জুন পালিত হয় হুল দিবস।

এদিন সালানপুরের জিৎপুর – উত্তর রামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ঘিয়াডোবা ফুটবল ময়দানে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বারাবনি বিধায়ক শ্রী বিধান উপাধ্যায়, পশ্চিম বর্ধমান জেলাশাসক পূর্ণেন্দু মাজি, অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ দপ্তরের প্রকল্প আধিকারিক শুভজিৎ বসু, আসানসোলের মহকুমাশাসক 

দেবজিৎ গাঙ্গুলী, সালানপুরের বিডিও শ্রী তপন সরকার।

উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের কর্মাধক্ষ মহম্মদ আর্মান , জেলা পরিষদ সদস্য কৈলাসপতি মন্ডল, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ফাল্গুনী কর্মকার, জিৎপুর – উত্তর রামপুর গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান তাপস সরকার, সালানপুর থানার আই সি ও আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও গুণী জনেরা। এরই সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অনেক সুপরিচিত সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

 সরকারী এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্টল দেওয়া হয় এবং অনুষ্ঠানটি ৩০ শে জুন এবং ১ জুলাই পর্যন্ত চলবে। অনুষ্ঠানে স্যানিটাইজেসনের ব্যবস্থা ছিল পর্যাপ্ত । সেখানে সাঁওতাল বিধবা রমণীদের পেনশন প্রদান করা হয়, সঙ্গে মাস্ক বিতরণ করা হয়, মোরোলদের দেওয়া হয় সম্মান, আদিবাসী অন্যান্য মানুষদের মধ্যে সম্মান প্রদান করা হয়। এরই সঙ্গে অসাধারণ সুন্দর সাঁওতালি নাচ, গানের আয়োজন করা হয় ।
জেলাশাসক পূর্ণেন্দু মাঝি বলেন যে,” উদ্দেশ্যে আদিবাসীদের এই সংগ্রাম সেই সংগ্রাম এখনো জারি রয়েছেএবং সেই একই উদ্দেশ্য নিয়ে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে এক শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে।”
  এদিকে বিধায়ক বিধান উপাধ্যায় বলেন, “এই সরকার সব দিক দিয়েই ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে যেমন সমস্ত প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের পাশে থাকেন সেরকম আদিবাসী সমাজের পাশেও রয়েছে এবং এমন মানবিক সরকারের পাশে আপনারও থাকুন শোষণ এবং তোষণ মুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে।”
প্রকল্প আধিকারিক , আসানসোলের মহকুমা শাসক, সালানপুর বিডিও বিভিন্ন প্রকল্পের সম্পর্কে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

সাঁওতালদের সম্পর্কে জানতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়। সাঁওতালরা প্রথমের দিকে বনে জঙ্গলে বাস করত ।
সর্বপ্রথম তারা বিহারের ভাগলপুরের এক বিস্তীর্ণ জঙ্গল কেটে তাদের বসতি স্থাপন করে। নাম দেয় দামিন -ই- কো । তৎকালীন সুদখোর মহাজন ও ব্রিটিশ শাসক প্রতিনিধি তাদের নানাভাবে শোষণ ও নির্যাতন করতে থাকে । ১৮৩৮ সালে তাদের কাছ থেকে ব্রিটিশরা খাজনা আদায় করে ২০০০ টাকা ।

 সালে সেটা বেড়ে হয় ৪৩,৯১৮ টাকা । এ ছাড়া তারা যেসব জীবজন্তু শিকার করত তাদের উদরপূর্তি করতে তা সব মহাজন,জমিদার , দারোগারা কেড়ে নিত । বসতি জমির উপর তাদের কোন মালিকানা দেওয়া হতনা । উপরন্ত ঐ সব জমিতে তাদেরকে দাসের মত খাটিয়ে ফসল উৎপাদন করানো হতো যাতে তাদের কোন অধিকার ছিলনা । মহাজনরা চড়া হারে সুদের কারবার করত তাদের সাথে । জমিদাররা নিপীড়ন করত নানাভাবে । এই অমানবিক শোষণ বঞ্চনা নিপীড়নের বিরুদ্ধে সিদু , কানু, চাঁদু ও ভৈরব – এই চার ভাইয়ের নেতৃত্বে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেন । ১৮৫৪ সালের শেষ থেকে ১৮৫৫ সালের শুরু পর্যন্ত বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ব্যাপূ আন্দোলন বিক্ষিপ্ত ভাবে হতেই থাকে । অবশেষে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভাগলদিঘি গ্রামে ৪০০ জন সাঁওতাল প্রতিনিধি বিভিন্ন স্থান থেকে এসে এক সভায় মিলিত হন । সেখানে তারা এই শাসনের শোষণের অবসানের নিমিত্তে স্বাধীনতার দাবি গ্রহন করে এক দাবী সনদ পেশ করেন দারোগা , ম্যাজিস্ট্রেট ,ও জমিদারের কাছে । ১৫ দিনের মধ্যে জবাব চাওয়া হয় । আন্দোলনের এক পর্যায়ে প্রায় ৫০০০০ আদিবাসী কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন দাবী সনদ নিয়ে । ব্রিটিশ সরকার প্রমাদ গুনে । চারিদিকে থানা, নীলকুঠি ,সৈন্যঘাটি আক্রান্ত ও ধ্বংস করে বিদ্রোহীরা । বড়লাট লর্ড ডালহৌসি মার্শাল ল জারী করে এই সাঁওতাল বিদ্রোহ দমন করার জন্য ১৫০০০ সৈন্য বাহিনীর সঙ্গে কামান বাহিনি ও হস্তিবাহিনি দিয়ে অভিযান করান । এই অভিযানে ১০০০০ সাঁওতাল প্রাণ হারান । আন্দোলনকারীরা বাহিনীর সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে গভীর জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেন । এই বিদ্রোহে সাঁওতালদের সঙ্গে তখনকার অনেক শোষিত মানুষও যোগ দেন । বিদ্রোহের আগুন কিন্তু ধিকি ধিকি করে বিহার, মুর্শিদাবাদ , বীরভূমের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে জ্বলতেই থাকে । যা দমন করতে ব্রিটিশ শাসকদের খুব বেগ পেতে হয়েছিল । ভাগলপুরে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে চাঁদ ও ভৈরব নিহত হন । ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিদুকে গ্রেপ্তার করে হত্যা করা হয় । বীরভূমে কানু ধরা পড়ে । পরে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় । ফাঁসীর মঞ্চে কানু বলেছিলেন -” আমি আবার ফিরে আসব , সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেব” ।

এই সংগ্রামে পরাজয় ছিল কিন্তু আপোষ ছিলনা । এই সংগ্রাম শিক্ষা দেয় শোষণ মুক্তির সংগ্রাম কোনদিন ফুরায়না । পৃথিবীতে যতদিন মানুষের উপর শোষণ থাকবে ততদিন সংগ্রামের প্রয়োজনও থাকবে ।
সাঁওতাল বিদ্রোহ সম্পর্কে উদ্বোধনের সময় সংবাদমাধ্যমকে বিধায়ক তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন যে ,”সে সময় অত মানুষকে একত্রিত করে , সঙ্গবদ্ধ করে এরকম একটি আন্দোলন গড়ে তোলা একটা বিশাল ব্যাপার ছিল কারণ তখন সংবাদ মাধ্যম, গণমাধ্যমের সাহায্য এসব কিছুই তাদের পক্ষে ছিলনা।” তাই ইতিহাসের পাতায় সিধু, কানু ও সাঁওতাল বিদ্রোহ অবিস্মরণীয় ইতিহাস গাথা হয়ে থাকবে।