আসানসোল – বোকারো মেমু ট্রেনের ও রোড ওভারব্রিজের সূচনায় রেল মন্ত্রী
পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের শিল্পাঞ্চলকে সংযুক্ত করল নতুন রেল করিডোর
বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* পূর্ব ভারতের শিল্প মানচিত্রে রবিবার এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হলো। বহু প্রতীক্ষিত আসানসোল-বোকারো স্টিল সিটি মেমু (মেমু) ট্রেনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলো। এদিন এক অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ট্রেনটির ফ্ল্যাগ অফ করেন। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।এদিন বিকেলে আসানসোল স্টেশনে রেল আধিকারিকদের উপস্থিতিতে সবুজ পতাকা দেখিয়ে এই ট্রেনের সূচনা করেন পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। এই ডেডিকেটেড মেইনলাইন ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা মেমু ট্রেন চালুর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক, পড়ুয়া এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের যাতায়াতের কষ্টের অবসান ঘটল। এর আগে তারা ব্যয়বহুল বাস এবং অনিয়মিত এক্সপ্রেস ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।এই ট্রেন চালু শিল্পের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।















এই নতুন ট্রেন পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া এবং বোকারোর মধ্যে একটি উচ্চ-গতির ও সাশ্রয়ী “স্টিল করিডোর” তৈরি করেছে। এদিনের ট্রেনের উদ্বোধনের মূল দিকগুলো হলোশ্রমশক্তির ক্ষমতায়ন। দুই শহরের ‘সেল’ প্রতিষ্ঠানের কারিগরি কর্মী ও শ্রমিকদের জন্য এখন যাতায়াতের একটি সরাসরি ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম তৈরি হয়েছে।দূরপাল্লার ট্রেনের মতো নয়, এই মেমু ট্রেনটি ছোট ছোট ইন্টারমিডিয়েট হল্ট স্টেশনগুলোতেও থামবে। এর ফলে পুরুলিয়া এবং আশেপাশের গ্রামীণ মানুষ উভয় ইস্পাত নগরীর বিশাল শহুরে বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন। এই ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় শতাধিক ছাত্রছাত্রী এখন প্রতিদিন আন্তঃরাজ্য সীমানা পেরিয়ে নামী কোচিং সেন্টার এবং কলেজগুলোতে যাতায়াত করতে পারবে। এর ফলে হোস্টেল বা ভাড়াবাড়িতে থাকার অতিরিক্ত খরচের আর প্রয়োজন হবে না। স্বল্পমূল্যের মাসিক সিজন টিকিট চালুর মাধ্যমে এই পরিষেবাটি দিনমজুরদের জন্য দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াতকে লাভজনক করে তুলেছে।পুরানো যাতায়াত ব্যবস্থার বদলে এই মেমু পরিষেবা আঞ্চলিক গতিশীলতাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আগে যাত্রীদের একাধিক বাস বদলানো এবং চড়া পরিবহন খরচ বহন করতে হতো। এখন কম খরচে মাসিক সিজন টিকিটের মাধ্যমে যাতায়াত অত্যন্ত সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে । নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে, এই ব্যবস্থাটি হাইওয়ে ট্রাফিক এবং বর্ষাকালীন ধসের সমস্যা থেকে সরে এসে একটি উচ্চ-গতির, সর্বকালীন বৈদ্যুতিক রেল করিডোরে রূপান্তরিত হবে। যা ঋতু নির্বিশেষে সঠিক সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করবে।এছাড়া, এই মেমু ট্রেন অ্যাক্সেসিবিলিটি বা সহজলভ্যতার দীর্ঘদিনের ঘাটতি পূরণ করবে ।
আগে দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো ছোট গ্রামীণ গ্রামগুলোকে এড়িয়ে যেত। কিন্তু এই পরিষেবাটি স্থানীয় হল্টগুলোতে স্টপেজ দেওয়ার ফলে পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল সরাসরি যুক্ত হয়েছে। এটি সরু ও জনাকীর্ণ রাস্তার ঝুঁকির তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ ও মসৃণ যাত্রা নিশ্চিত করবে। যাতায়াতের বাইরেও, এই পরিষেবাটি মধ্যবর্তী ছোট স্টেশনগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জোয়ার আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। নিয়মিত যাত্রীদের যাতায়াত বাড়লে স্থানীয় দোকানপাট ও পরিষেবার উন্নতি ঘটবে। এছাড়াও , বর্ষাকালে ট্রেনের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করবে যে আবহাওয়া জনিত কারণে রাস্তা বন্ধ হলেও অঞ্চলের অর্থনীতি নিরবচ্ছিন্ন থাকবে।রেলের তরফে বলা হয়েছে , রবিবার উদ্বোধনী বিশেষ ট্রেনটি আসানসোল থেকে যাত্রা শুরু করবে। নিয়মিত ভাবে এই মেমু ট্রেনের চলাচল আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি (রবিবার ব্যতীত) থেকে শুরু হবে। ০৩৫৯২ আসানসোল-বোকারো স্টিল সিটি মেমু, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (রবিবার) ৮টি কোচ বিশিষ্ট মেমু রেক সহ চলবে। ট্রেনটি আসানসোল থেকে বিকাল ৫টায় যাত্রা শুরু করে। বোকারো স্টিল সিটিতে রাত ৯টায় পৌঁছাবে। ট্রেনটি এই রুটে বার্নপুর, দামোদর, মধুকুণ্ড, মুরাডিহ, রামকানালি, বেরো, জয়চণ্ডী পাহাড়, আনারা, পুরুলিয়া, গৌরীনাথধাম, পুন্ডগ এবং রাধাগাঁও স্টেশনে থামবে। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) থেকে ৬৩৫৯২ আসানসোল-বোকারো স্টিল সিটি মেমু ট্রেন আসানসোল থেকে সকাল ৭:০০ টায় ছাড়বে ও বোকারো স্টিল সিটিতে ১১:১৫ টায় পৌঁছাবে।৬৩৫৯১ বোকারো স্টিল সিটি-আসানসোল মেমু বোকারো স্টিল সিটি থেকে বিকেল ৩:৪০ টায় ছাড়বে ও আসানসোলে সন্ধ্যা ৭:৩০ টায় পৌঁছাবে।
বন্ধ গেট” যুগের অবসান ফলক উন্মোচনে অগ্নিমিত্রা পাল
পশ্চিম বর্ধমান জেলার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের ” স্টপ – এ্যান্ড – গো ” পরিস্থিতির রবিবার সরকারিভাবে অবসান ঘটলো। কেন্দ্রীয় রেল, তথ্য ও সম্প্রচার এবং ইলেকট্রনিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলে কুমারপুর রোড ওভার ব্রিজটি জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলেন । বীরভূমে দ্রুত আধুনিকীকরণের পথে এই মাইলফলক স্পর্শ করার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। আসানসোলের কুমারপুরে এক অনুষ্ঠানে এই রোড ওভারব্রিজ বা আরওবির ফলক উন্মোচন করেন আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কুলটির বিধায়ক ডাঃ অজয় পোদ্দার, বিজেপির আসানসোল সাংগঠনিক জেলার সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্য ও পূর্ব রেলের আসানসোল ডিভিশনের আধিকারিকরা।
এই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অগ্নিমিত্রা পাল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্য সরকারের সরকারের সমালোচনা করেন। এর পাশাপাশি তিনি দলের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা আসানসোলের সাংসদ বর্তমানে রাজ্যের মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কেও আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, রাজ্যের বর্তমান সরকারের মেয়াদ আর দুমাস। বাংলার মানুষকে আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার অত্যাচার সহ্য করতে হবে না। নির্বাচনের পরে এই বাংলায় বিজেপি সরকার গঠন করবে। তখন উন্নয়নের জোয়ার আসবে। বিজেপি বিধায়ক বলেন, রাজ্য সরকার বাংলায় কোন কাজে কেন্দ্রীয় সরকারকে সাহায্য করে না। জমি দেওয়া হয়না। তাহলে তো কেন্দ্র সরকারের নাম হবে। বাবুল সুপ্রিয় সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া, তার আমলে এই আরওবি তৈরির কাজ শুরু হয়। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। এটা তো রেল ও সেল যৌথ ভাবে তৈরি করেছে। খরচ হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। উনি প্রথম একাদশে খেলার জন্য বিজেপি ছেড়ে তৃনমুল কংগ্রেসে যোগ দেন। খেলছেন কি না তা বলতে পারবো। এদিকে, রেলের তরফে বলা হয়েছে, পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলের কুমারপুরের এই আরওবি গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক বা জিটি রোডের শিল্প প্রবাহে বিপ্লব ঘটাতে প্রস্তুত। শহরের প্রধান “চোক পয়েন্ট” বা যানজটের কেন্দ্রবিন্দুটি সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই সেতুটি নিশ্চিত করবে যে শিল্পের চাকার অগ্রগতি যেন কখনো না থামে। কয়লা এবং ইস্পাত বহনকারী ভারী যানবাহনগুলো এখন অতীতের যানজট এড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খণ্ড সীমান্তের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও সচল করতে পারবে।এর পাশাপাশি ইঞ্জিন চালু রেখে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার খরচ বন্ধ হওয়ায় হাজার হাজার নিত্যযাত্রীর জ্বালানি সাশ্রয় হবে। এই সেতুটি একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ রেলওয়ে ইন্টারসেকশনে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকে চিরতরে নির্মূল করলো।বরাচকের মতো শহরতলি এলাকাগুলো এখন আসানসোল শহরের মূল কেন্দ্রের সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত হলো। যা নিশ্চিত করছে যে দিনমজুর, অফিস যাত্রী এবং ছাত্রছাত্রীদের আর কখনও দেরি হবে না।নতুন বাংলার জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং অগ্রগতিএই প্রকল্প উচ্চ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিল্প শক্তির এক সম্মিলিত রূপকল্পের প্রতিফলন। ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংগুলিকে অত্যাধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল দ্বারা প্রতিস্থাপিত করে। রেল মন্ত্রক এটি নিশ্চিত করছে যে পশ্চিম বর্ধমানের শিল্প সংকল্প আর যেন “বন্ধ গেটে” আটকে না থাকে।


