ঋণের বোঝা, এক লক্ষ চাকরি, মহিলাদের মাসে ৩ হাজার টাকা, ২০ শতাংশ ডিএ বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা
*বেঙ্গল মিরর, কলকাতা, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সোমবার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।বাজেট পেশের আগে অর্থ মন্ত্রী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বিধানসভার ভেতরে মন্দিরে পুজো দেন। এদিন বিধানসভায় বাজেট বক্তৃতায় অর্থ মন্ত্রী একদিকে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল ঋণের বোঝার কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে ‘বিকশিত বাংলা’-র লক্ষ্যে প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মসংস্থান, নারী ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং পরিকাঠামো নির্মাণে একাধিক বড় ঘোষণার কথা জানান।বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, মে মাসের রাজনৈতিক পরিবর্তন শুধুমাত্র সরকার বদল নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের মানুষের নিজেদের স্বকীয়তা পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ সংগ্রামের ফল।














বাংলাকে পুনরায় দেশের বৌদ্ধিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের আসনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।অর্থমন্ত্রীর দাবি, নতুন সরকার পূর্ববর্তী প্রশাসনের কাছ থেকে ৮ লক্ষ ১৫ হাজার ৮৯১ কোটি টাকার ঋণের বোঝা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। তবে কেন্দ্রের সহযোগিতা ও আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে সেই ঋণকে নিয়ন্ত্রণে এনে রাজস্ব ঘাটতি এবং আর্থিক ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করা হবে।স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘আপনার সরকার, আপনার পাশে’ কর্মসূচি এবং ১৮০০-৮২০-৮২০ টোল-ফ্রি হেল্পলাইন চালুর ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি পরিষেবার জন্য ১১২ নম্বর চালু করার কথাও জানানো হয়েছে।
প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর এবং আরামবাগকে নতুন জেলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘোষণা, রাজ্যের বিভিন্ন দফতরে এক লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ। এর মধ্যে ৫০ হাজার শিক্ষক, ২০ হাজার পুলিশ কর্মী এবং এক হাজার ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস পদে নিয়োগ হবে। মোট পদের ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং যেখানে প্রযোজ্য, সেখানে অগ্নিবীরদের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।নারী ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ চালুর ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী।
এই প্রকল্পের আওতায় ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের অবিবাহিত ছাত্রীদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।আগামী ১ জুন, ২০২৬ থেকে রাজ্য পরিবহণ নিগমের বাসে সমস্ত মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা দেওয়া হবে। এর জন্য চালু করা হবে ‘পিঙ্ক কার্ড’। নারী সুরক্ষার জন্য প্রতিটি মহকুমায় মহিলা থানা, নারী সহায়তা ডেস্ক এবং ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’ গঠনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্য রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীতে মাতঙ্গিনী হাজরা এবং রানি শিরোমণির নামে দুটি সম্পূর্ণ মহিলা ব্যাটালিয়ন তৈরি করা হবে।
সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য অতিরিক্ত ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ও রিলিফ ঘোষণা করা হয়েছে। যা ১ অক্টোবর, ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রিন পুলিশ, ভিলেজ পুলিশ, হোমগার্ড, এনভিএফ কর্মী, প্রাণীবন্ধু-সহ বিভিন্ন চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের মাসিক ভাতাও ২ হাজার টাকা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রাজ্য পরিবহণ নিগমের কন্ডাক্টরদের মাসিক পারিশ্রমিক ১৬ হাজার টাকা করা হবে।অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকা পেনশন, কারাবাস ভোগ করা ব্যক্তিদের জন্য ১০ হাজার টাকা পেনশন এবং রাজনৈতিক কারণে মিথ্যা মামলার শিকার ব্যক্তিদের জন্য ‘সংগ্রামী ভাতা’ চালুর কথাও ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী।
গ্রামীণ উন্নয়নে ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং আবাসন প্রকল্পে ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবর্ষে ২৫ লক্ষ নতুন উপভোক্তাকে আবাসনের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পের উপভোক্তাদের জন্য ১২৫ কর্মদিবস নিশ্চিত করার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।ঝাড়গ্রামে প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ট্রাইবাল ইউনিভার্সিটি স্থাপন, চা শ্রমিকদের জন্য পৃথক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড, গিগ ওয়ার্কারদের জন্য ওয়েলফেয়ার বোর্ড এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।এছাড়া শহরাঞ্চলে আরও ২১০টি ‘মা আহার কেন্দ্র’ চালু করা হবে, যেখানে পাঁচ টাকায় পুষ্টিকর খাবার পাওয়া যাবে।
বয়স্ক, বিধবা এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের মাসিক পেনশন ৫০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একাধিক বৃহৎ প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড় এলাকায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, ডানকুনিকে মাল্টিমোডাল লজিস্টিক্স হাব হিসেবে গড়ে তোলা, কালনা-শান্তিপুরের মধ্যে নতুন সেতু, চিংড়িঘাটা-নিউটাউন এলিভেটেড করিডর এবং হুগলিতে নতুন কৌশলগত সড়ক করিডর তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।প্রথম বাজেটের মাধ্যমে বিজেপি সরকার একদিকে যেমন পূর্ববর্তী সরকারের আর্থিক নীতির সমালোচনা করেছে, তেমনই ‘বিকশিত বাংলা’ গড়ার লক্ষ্যে কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, নতুন সরকারের এই প্রথম বাজেট আগামী দিনের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক নীতির দিশা স্পষ্ট করে দিল।


