বালি নেই, থমকে উন্নয়ন! পশ্চিম বর্ধমানে স্টোন ডাস্টেই চলছে নির্মাণ কর্মহীন হয়ে ভিনরাজ্যে শ্রমিকদের পাড়ি
*বেঙ্গল মিরর, কুলটি ও আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* পশ্চিম বর্ধমানের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিনের বালির সংকট এবার নির্মাণ শিল্পে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বৈধভাবে বালির সরবরাহ কার্যত বন্ধ, বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত বালি না মেলায় ছোট-বড় নির্মাণ প্রকল্প কার্যত থমকে গিয়েছে। বাধ্য হয়ে বহু নির্মাণকাজে বালির পরিবর্তে স্টোন ডাস্ট ব্যবহার করা হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে সব ধরনের নির্মাণে এটি নিরাপদ বা উপযুক্ত বিকল্প নয়। ফলে নির্মাণের গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন রাজমিস্ত্রি, নির্মাণ শ্রমিক, ঠিকাদার এবং নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ীরা। কাজের অভাবে বহু শ্রমিক ইতিমধ্যেই ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা এবং দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন।














এলাকায় যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের অনেকেই সপ্তাহে এক-দু’দিনের বেশি কাজ পাচ্ছেন না। সংসার চালানোই এখন তাঁদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।বর্তমানে নিয়ামতপুর সর্বজনীন ছটপুজো সমিতির উদ্যোগে ছটঘাট নির্মাণের কাজ চলছে। কিন্তু সেখানেও বালির পরিবর্তে স্টোন ডাস্ট ব্যবহার করতে হচ্ছে। সমিতির সভাপতি শিব প্রসাদ রাউত জানান, আগের মতো বালির জোগান নেই।
বাজারে যে সামান্য বালি পাওয়া যাচ্ছে, তার দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। তাই বাধ্য হয়েই স্টোন ডাস্ট দিয়ে নির্মাণকাজ চালাতে হচ্ছে।তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর বর্ষার আগেই ছটঘাট নির্মাণ শেষ করার পরিকল্পনা থাকে, যাতে ছটপুজোর আগে সমস্ত প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করা যায়। কিন্তু এ বছর বালির তীব্র সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তাঁর কথায়, স্টোন ডাস্ট দিয়ে কাজ চালানো গেলেও এটি কোনো স্থায়ী বা আদর্শ সমাধান নয়।স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু ছটঘাট নয়, নতুন বাড়ি নির্মাণ, মন্দির সংস্কার, সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্প, রাস্তা, ড্রেন-সহ বিভিন্ন নির্মাণকাজও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু প্রকল্প মাঝপথে থেমে রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নির্মাণসামগ্রীর দোকান, পরিবহণ ব্যবসা, সিমেন্ট-রড বিক্রেতা এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপরেও।অন্যদিকে, জেলার সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বৈধভাবে বালির সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় নির্মাণ ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনই অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে বিকল্প উপকরণ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এতে ভবিষ্যতে নির্মাণের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।নির্মাণ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নির্দিষ্ট কিছু কাজে স্টোন ডাস্ট ব্যবহার করা গেলেও সব ধরনের ঢালাই বা নির্মাণে এটি বালির পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু নির্মাণ শিল্পের সংকটই নয়, ভবিষ্যতের অবকাঠামোগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।শিব প্রসাদ রাউত জেলা প্রশাসন ও রাজ্য সরকারের কাছে দ্রুত বৈধ বালির সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য, বালির সংকট শুধু একটি নির্মাণসামগ্রীর অভাব নয়, এটি হাজার হাজার শ্রমিকের রুজি-রুটি, স্থানীয় অর্থনীতি এবং উন্নয়নের গতিকে রুদ্ধ করে দিয়েছে।বালির এই সংকট, এই জেলা তথা শিল্পাঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি যেন গোটা নির্মাণ শিল্পের সংকটের প্রতিচ্ছবি। বেআইনি বালি পাচার রুখতে কঠোর নজরদারি যেমন জরুরি, তেমনি বৈধ উপায়ে পর্যাপ্ত বালির সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমানভাবে প্রয়োজন। অন্যথায় স্টোন ডাস্টে আপস করে হয়তো কিছু নির্মাণ শেষ হবে, কিন্তু উন্নয়নের গতি আরও মন্থর হবে, কর্মসংস্থান কমবে এবং হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।এখন প্রশ্ন একটাই—বালির সংকটের স্থায়ী সমাধান কবে? নাকি স্টোন ডাস্টে আপস করাই হবে নির্মাণ শিল্পের নতুন বাস্তবতা?


