রাতের অন্ধকারে উধাও রাহুল সাংকৃত্যায়নের ৯ ফুট মূর্তি, রানিগঞ্জে বিক্ষোভ
বেঙ্গল মিরর, চরণ মুখার্জী, রানিগঞ্জ, পশ্চিম বর্ধমান:* রাতারাতি গায়েব হয়ে গেল পদ্মভূষণপ্রাপ্ত হিন্দি ভ্রমণ সাহিত্যের বিশিষ্ট পণ্ডিত, মার্কসবাদী মনীষী রাহুল সাংকৃত্যায়নের ৯ ফুট উচ্চতার পূর্ণাবয়ব মূর্তি। রানিগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র পাঞ্জাবি মোড়ে ১৯ নং জাতীয় সড়কের ধারে সার্ভিস রোডের পাশে কুড়ি ফুট উঁচু বেদীর উপর স্থাপিত মূর্তিটি রবিবার রাতের অন্ধকারে কে বা কারা ভেঙে নিয়ে গেছে। এই ঘটনায় রানিগঞ্জ জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।*কীভাবে ঘটল ঘটনা* স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার গভীর রাতে এলাকার সিসিটিভি বন্ধ করে রাস্তার আলো নিভিয়ে দুষ্কৃতিরা এই কাজ করে।














সোমবার সকালে এলাকাবাসী দেখেন মূর্তি ঘেরা অংশটি ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে আছে। বেদীর অংশটি একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মূর্তির দু-একটি টুকরো আশেপাশে পড়ে থাকলেও সম্পূর্ণ মূর্তির কোনো হদিশ মেলেনি।১৯৯৩ সালে রাহুল সাংকৃত্যায়নের ১০০তম জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে রানিগঞ্জ কয়লাঞ্চলে বছরভর কর্মসূচি পালনের পর পাঞ্জাবি মোড়ে এই মূর্তি স্থাপন করা হয়। জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের সময় মূর্তিটি পরে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।
প্রতি বছর তার জন্ম ও মৃত্যু দিবসে এই মূর্তির পাদদেশেই বিভিন্ন অনুষ্ঠান হত। ১৯৪ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন রাজ্য মন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ চৌধুরী মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাহুলের স্ত্রী কমলা সাংকৃত্যায়ন, পুত্র জেতা ও কন্যা জয়া সাংকৃত্যায়ন। সারা দেশের মধ্যে রানিগঞ্জেই রাহুল সাংকৃত্যায়নের প্রথম পূর্ণাবয়ব মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
*প্রশাসনের দ্বারস্থ সংগঠনগুলি* ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ ও অপর এক সংগঠনের পক্ষ থেকে রানিগঞ্জ থানা ও পাঞ্জাবি মোড় ফাঁড়িতে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়। তাদের দাবি, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। একইসঙ্গে পাঞ্জাবি মোড়েই রাহুল সাংকৃত্যায়নের মূর্তি পুনঃস্থাপনের দাবি জানানো হয়।লেখক শিল্পী সংঘ পশ্চিম বর্ধমান জেলা যুগ্ম সম্পাদক অনুপ মিত্র বলেন, “এটি শুধু একটি মূর্তি ভাঙার ঘটনা নয়।
এটি আমাদের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর আঘাত। একজন সাহিত্য অকাদেমি ও পদ্মভূষণপ্রাপ্ত, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মনীষীর স্মৃতিকে মুছে ফেলার চেষ্টা উদ্বেগজনক।”*পথসভা ও বিক্ষোভ* এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিকেলে পাঞ্জাবি মোড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও পথসভার আয়োজন করে কয়লাঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলি।
সভায় বক্তব্য রাখেন অভিজিৎ খাঁ, অরুণ পাণ্ডে, কুন্তল চ্যাটার্জি, বীরযু যাদব, সঞ্জয় প্রামাণিক, হেমন্ত পভকর। উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন বিধায়ক রুনু দত্ত, নাট্যকার নীলাঞ্জন ঘটক প্রমুখ।বক্তারা বলেন, “লেনিন থেকে রাহুল সাংকৃত্যায়ন – মূর্তি ভাঙার ট্রেডিশন পশ্চিমবঙ্গে সমান তালে চলছে। রাহুল সাংকৃত্যায়ন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিন বছর জেল খেটেছেন। দেশের কৃষক সভা গঠনে ও স্বাধীনতা আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
তার ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’, ‘ভাগো নেহি, দুনিয়া কো বদলো’-র মতো বই আজও মানুষকে পথ দেখায়।”পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের রাজ্য সম্পাদক রজত বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। গণ আন্দোলনের নেতা পার্থ মুখার্জি পশ্চিম বর্ধমান জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন।
সিআইটিইউ-এর রাজ্য কাউন্সিল অধিবেশনেও এই ঘটনার নিন্দা করে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।*রাহুল সাংকৃত্যায়নের সঙ্গে রানিগঞ্জের যোগ* প্রয়াত শ্রমিক নেতা বিবেক চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৯৯৩ সালে রানিগঞ্জে রাহুল সাংকৃত্যায়ন জন্ম শতবার্ষিকী কমিটি গঠিত হয়। শহরের একটি রাস্তার নামকরণও হয়েছিল “রাহুল সাংকৃত্যায়ন মার্গ”।সংগঠনগুলির স্পষ্ট দাবি, অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং একই স্থানে রাহুল সাংকৃত্যায়নের মূর্তি পুনঃস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি রাহুল সাংকৃত্যায়নের চিন্তা ও আদর্শকে আরও ব্যাপকভাবে মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকারও করেন তারা।


