গ্যাস সংকটের কারণে সালানপুরে আচমকা বন্ধ বেসরকারি কারখানা শ্রমিকদের বিক্ষোভ, দ্বারস্থ লেবার কমিশনের
*বেঙ্গল মিরর,, সালানপুর ও আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* গ্যাস ঘাটতির অজুহাত দেখিয়ে আচমকা কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলো কারখানা কর্তৃপক্ষ। আর এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই তীব্র উত্তেজনা ছড়াল আসানসোলের সালানপুরের দেন্দুয়ায় বেসরকারি ‘বালাজি সিরামিক্স’ কারখানায়। কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং সঠিক মজুরির দাবিতে শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন কারখানার কয়েকশো শ্রমিক। পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেও, এখনও পর্যন্ত কোনো রফাসূত্র মেলেনি বলেই খবর।আচমকা কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ায়, ক্ষোভে ফেটে পড়লেন শ্রমিকেরা।













শ্রমিকেরা জানান, গত ৩০ মে কারখানা কর্তৃপক্ষ গ্যাসের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে আচমকা উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এই খবর ছড়াতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন কর্মরত শ্রমিকেরা। তাঁদের মূল অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শ্রমিকদের সঠিক ও ন্যায্য মজুরি দেওয়া হচ্ছিল না। এই চরম আর্থিক অনটনের বাজারে কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই আচমকা কারখানা বন্ধ করে দেওয়ায় তাঁরা সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।শ্রমিকদের স্পষ্ট দাবি, কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও তাঁদের নিয়মিত মজুরি দিতে হবে। এই দাবি নিয়ে গত ৩০ মে নেতা অমর মাহাতোর নেতৃত্বে শ্রমিকেরা কারখানা কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন।
সেই সময় কর্তৃপক্ষের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে আগামী ২ জুন মঙ্গলবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো এদিন শ্রমিকেরা কারখানায় এলে তাঁদের ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়। অভিযোগ, কারখানা কর্তৃপক্ষ তাঁদের স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, শ্রমিকদের কোনো দাবি বা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষের এই অনমনীয় ও উদাসীন মনোভাবের পরেই শ্রমিকেরা কারখানায় জড়ো হয়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন।
আন্দোলনকারীদের তরফে নেতা অমর মাহাতো বলেন, এখানে প্রতিনিয়ত শ্রমিকদের চরম শোষণ করা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে এই কারখানায় কাজ করার পরেও শ্রমিকদের ন্যূনতম আইনি অধিকারটুকু দেওয়া হয়নি। এই কারখানায় সরকারি নিয়ম মেনে ধার্য করা ন্যূনতম বেতন দেওয়া হয় না। নেই কোনো শ্রম সুরক্ষার ব্যবস্থা। এমনকি পিএফ ও ইএসআইয়ের মতো অতি প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষামূলক সুবিধাও শ্রমিকদের দেওয়া হয়নি এতদিন।এদিকে, এই আন্দোলনের মাঝেই শ্রমিকদের মধ্যে একপ্রকার মতভেদ বা ভাগ লক্ষ্য করা গেছে।
অধিকাংশ মহিলা ও পুরুষ শ্রমিক যখন অধিকারের দাবিতে আন্দোলনের পথে, ঠিক তখনই অন্য একদল শ্রমিক কারখানার সমস্ত শর্ত মেনে নিয়েই কাজ করতে ইচ্ছুক প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, কারখানা যেমন চলছে চলুক, তারা কর্তৃপক্ষের সমস্ত দাবি মেনেই কাজ চালিয়ে যেতে রাজি।এই গোটা ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠছে। শ্রমিকদের দাবি, কর্তৃপক্ষ তাঁদের জানিয়েছে যে সাংবাদিক ছাড়া তারা একান্তে আলোচনায় রাজি। কিন্তু কেন সংবাদমাধ্যমকে এত ভয় বা এড়িয়ে চলার চেষ্টা, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য সাংবাদিকরা কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও, তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বলত গেলে তারা কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন।কারখানা কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আলোচনার দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় এবার আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটছেন শ্রমিকেরা। জানা গেছে, মঙ্গলবার শ্রমিকদের তরফ থেকে একটি ‘মাস পিটিশন’ বা গণস্বাক্ষর সম্বলিত আবেদনপত্র তৈরি করা হয়।
নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে এবং কর্তৃপক্ষের এই একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা লেবার কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছেন।এই ঘটনার জেরে দেন্দুয়া শিল্পতালুকে যথেষ্টই উত্তেজনা তৈরী হয়েছে। একদিকে পেটের টান, অন্যদিকে অধিকারের লড়াই, এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দেন্দুয়ার বালাজি সিরামিক্সের ভবিষ্যৎ এবং লেবার কমিশনের হস্তক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে কারখানার শ্রমিক থেকে এলাকার বাসিন্দারা।


