ভোট দিতে পারলেন না বারাবনির দুই ভোটার নামের পাশে ‘পোস্টাল ব্যালট’- র সিল! কমিশনের ভূমিকায় প্রশ্ন
*বেঙ্গল মিরর, সালানপুর ও বারাবনি, রাজা বন্দোপাধ্যায় ও মনোজ শর্মাঃ* গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসব নির্বাচন। যেখানে একজন ভোটার তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন।কিন্তু সেই উৎসবে শামিল হতে গিয়ে চরম হেনস্থার শিকার হলেন পশ্চিম বর্ধমান জেলার বছর ২৯ র যুবতী সঞ্চিতা রজক। বৃহস্পতিবার বিকেলে বুথে গিয়ে ভোট দেওয়ার আগেই তিনি দেখলেন ভোটার তালিকায় তাঁর নামের পাশে লেখা রয়েছে ‘পোস্টাল ব্যালট’ (পিবি) র সিল! ঘটনাটি ঘটেছে বারাবনি বিধানসভা কেন্দ্রের দোমহানি গার্লস হাইস্কুলের ২০৪ নম্বর বুথে।














শুক্রবার সঞ্চিতা রজক বলেন, বৃহস্পতিবার নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে বিকেল ৪টে নাগাদ বুথে গিয়ে লাইনে দাঁড়াই। ইভিএম বিভ্রাটের কারণে দীর্ঘক্ষণ লাইনে অপেক্ষা করতে হয় আমাকে। অবশেষে যখন আমার ভোট দেওয়ার সময় আসে, তখন বুথে কর্তব্যরত নির্বাচনী আধিকারিক আমাকে ভোট দিতে বাধা দেন। তিনি আরো বলেন, ভোট কর্মী আমাকে জানান, ভোটার তালিকায় সঞ্চিতা রজকের নামের পাশে ‘পিবি বা পোস্টাল ব্যালট’ লেখা সীলমোহর রয়েছে। বলা হয় আমি নাকি আগেই পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়ে দিয়েছি।
এমনকি আমাকে একজন ‘চাকরিজীবী’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।সঞ্চিতা বর্তমানে চাকরি পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতামুলক পরিক্ষায় বসার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি কোনো সরকারি কর্মী বা নির্বাচনী কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। ফলে তার নামে পোস্টাল ব্যালট ইস্যু হওয়া কার্যত অসম্ভব। সঞ্চিতার দাবি “আমি একজন সাধারণ মানুষ। কোনো সরকারি চাকরি করি না। তাহলে আমার নামের পাশে পোস্টাল ব্যালটের সিল এল কিভাবে? আমি বিএলওর সাথে যোগাযোগ করেছি। নির্বাচন কমিশনের টোল-ফ্রি নম্বরে ফোন করে গোটা বিষয়টি বলেছি।
ইমেলে অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কোনো সদুত্তর মেলেনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও শুধুমাত্র প্রশাসনিক ভুলের কারণে একজন সচেতন নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নিজের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে ঐ যুবতী বর্তমানে অত্যন্ত হতাশ।এদিকে, আরো একটি একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বারাবনি বিধানসভার সালানপুর ব্লকে। সকাল সকাল ভোট দিতে গিয়ে ৬৫ বছরের ভোটারকে শুনতে হলো তার পোস্টাল ব্যালটে ভোট হয়ে গেছে।
না তিনি কখনোই কোন সরকারি দপ্তরে একদিনের জন্য চাকরি করেননি। স্বাভাবিকভাবে ভোটে তার কোনদিনই ডিউটিও পড়েনি। বারাবনি বিধানসভার সালানপুর ব্লকের রূপনারায়নপুরের বাসিন্দা ৬৫ বছরের ভোটারের নাম অরিন্দম বন্দোপাধ্যায়।এবারের বিধানসভা ভোটে তারই জীবনে এমনই এক অভিনব ঘটনা ঘটলো, তাও আবার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে। সরকারি বুথ কর্মীর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে অরিন্দমবাবু বারাবনি বিধানসভার সালানপুর ব্লকের ৬৫ নম্বর বুথ অগ্রদূত পাঠাগারে ৭৪৮ ক্রমিক সংখ্যার ভোটার।
বৃহস্পতিবার সকালে ভোটের লাইনে তিনি দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন বুথের ভেতরে ঢোকেন তখন তার ভোটার কার্ড এবং বুথ স্লিপ দেখে বলা হয় তার পোস্টাল ব্যালটে ভোট হয়ে গেছে। তা শুনে অরিন্দমবাবু রীতিমতো হকচকিয়ে গিয়ে বলেন, আমি তো সরকারি কর্মচারী নই। কোনদিন ছিলাম না। আমার পেশায় গৃহ শিক্ষক ।তাহলে পোস্টাল ব্যালটে ভোট হলো কি করে ?
কে আমার এই ব্যালেট ভোট দিল? ক্ষুব্ধ হয়ে অরিন্দমবাবু প্রিসাইডিং অফিসারকে জানালে তিনি বলেন, আমার কিছু করার নেই। ভোট না দিয়ে তারপর তিনি বাইরে এসে পুরো বিষয়টি স্থানীয় তৃণমূল নেতা ব্লকের সহ-সভাপতি বিজয় সিংকে জানান। তিনি তাকে বিডিও এবং জেলাশাসককে ব্যাপারটি জানাতে বলেন। সালানপুরের বিডিও দেবাঞ্জন বিশ্বাসের কাছে তিনি মৌখিকভাবে সকালের দিকেই জানাতে যান । বিডিও তাকে লিখিতভাবে অভিযোগ জানাতে বলেন। সেই মতো বিকেলে তিনি যাবতীয় তথ্য দিয়ে বিডিওর কাছে অভিযোগ পত্র জমা দিয়েছেন।
বিডিও দেবাঞ্জন বিশ্বাস অভিযোগে পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, অভিযোগটি আমি জেলা নির্বাচনী দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিভাবে এটা হলো, তা তিনি অবশ্য তা বলতে পারেন না।অরিন্দমবাবুর স্ত্রী জুঁই বন্দোপাধ্যায় বলেন, ভয়ংকর গরমে ভোট দিতে না পারার পরে ভোটার কার্ড বুথের স্লিপ জেরক্স করে অভিযোগ লিখে নিয়ে রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েন স্বামী। মানসিকভাবেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
এই প্রসঙ্গে অরিন্দমবাবু জানিয়েছেন, লিখিতভাবেই আমি আমার অভিযোগ বৃহস্পতিবার বিকেলে বিডিও অফিসের আধিকারিকের হাতে জমা দিয়েছি। স্বাভাবিক ভাবেই এইসব ঘটনার পরেনির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা, তাদের ভূমিকা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার এই ধরনের বড়সড় ত্রুটি নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে । এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই ভুল সংশোধন করে এইসব ভোটারদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা করে কি না।

