কাঠগড়ায় তৃণমূল ভোট শেষের ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই উত্তপ্ত আসানসোল স্ত্রী ও সন্তানের সামনে কংগ্রেস সমর্থককে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ গ্রেফতারের দাবিতে থানায় বিক্ষোভ
*বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* মাত্র দুদিন হলো রাজ্যে প্রথম দফায় পশ্চিম বর্ধমান জেলার নয়টি সহ ১৫২ টি কেন্দ্রে ভোট হয়েছে। তারমধ্যেই শুক্রবার রাতে আসানসোলে এক কংগ্রেস সমর্থককে স্ত্রী ও সন্তানের সামনে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠলো শাসক দলেরসেখ কর্মীদের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগ সরাসরি করেছেন আসানসোল উত্তর বিধানসভার কংগ্রেসের প্রার্থী প্রসেনজিৎ পুইতুন্ডি। তার কথায়, এই ঘটনায় অভিযুক্ত তিনজন ২২ নং ওয়ার্ডের শাসক দলের কাউন্সিলার ঘনিষ্ঠ ও কল্যানপুর হাউজিং এলাকার বাসিন্দা।যদিও, শাসক দলের তরফে রাজ্য সম্পাদক ভি শিবদাসন ওরফে দাসু ও আসানসোল পুরনিগমের ২২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অনিমেষ ওরফে অনির্বাণ দাস এই ঘটনার সঙ্গে রাজনীতি ও দলের কোন সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন।














আসানসোল দক্ষিণ থানার (পিপি) বিবেকানন্দ সরণী বা সেনরেল রোডের অনন্যা কমপ্লেক্সের বাসিন্দা মৃত কংগ্রেস সমর্থকের নাম দেবদীপ চট্টোপাধ্যায় (৪২)। অনন্যা কমপ্লেক্সের মেনগেটের সামনে লাগানো সিসি ক্যামেরায় ঐ যুবককে মারধর যে করা হচ্ছে, তার ফুটেজ ধরা পড়েছে। তাতে তিনজনকে তাকে মারধর ও ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেল দেওয়ার ছবি ধরা পড়েছে। তাতে যুবকের স্ত্রী ও ছেলেকে যারা মারছে, তাদেরকে না মারতে অনুরোধ করারও ছবি দেখা যাচ্ছে।শনিবার সকাল এগারোটার পরে কংগ্রেস সমর্থকের দেহ নিয়ে প্রসেনজিৎ পুইতুন্ডি ও তার ইলেকশন এজেন্ট শাহ আলম খান সহ কংগ্রেস নেতা ও কর্মী এবং পরিবারের সদস্যরা আসানসোল দক্ষিণ থানা পিপিতে আসেন।
তারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানান। খবর পেয়ে পুলিশ আধিকারিকরা সেখানে আসেন। তারা তাদের সঙ্গে গোটা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। বিকেল চারটের পরে পুলিশ মৃতদেহটি আসানসোল জেলা হাসপাতালে নিয়ে যায়। মৃত যুবকের স্ত্রী প্রাথমিক ভাবে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। রবিবার সকালে আসানসোল জেলা হাসপাতালে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হবে। পুলিশ ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে জানা গেছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে গোটা ঘটনাটি ঠিক কি, তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
তবে, এই ঘটনায় আসানসোল দক্ষিণ থানার পুলিশের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জানা গেছে, রাত দুটো নাগাদ এই ঘটনাটি ঘটেছে। সেই খবর পেয়ে আসানসোল দক্ষিণ থানার পুলিশ সেখানে যায়। সেই সময় কংগ্রেস সমর্থক আহত অবস্থায় পড়েছিলো। পুলিশ তাকে তার স্ত্রীকে বাড়ি নিয়ে চলে যেতে বলে। যারা তাকে মারধর করে বলে অভিযোগ, তাদেরকে পুলিশ সেখান থেকে চলে যেতে বলে। তাদেরকে পুলিশ আটক করা বা আহত যুবকের চিকিৎসা কোনটাই পুলিশ করেনি বলে অভিযোগ।
আরো জানা গেছে, পুলিশের কথা মতো দেবদীপ চট্টোপাধ্যায়কে তার স্ত্রী পিয়ালি চট্টোপাধ্যায় রাত দুটোর পরে বাড়ি নিয়ে যায়। তারপর সে শুয়ে পড়ে। শনিবার সকাল এগারোটা পর্যন্ত সে ঘুম থেকে উঠেনি। তারপর স্ত্রী তাকে উঠাতে গিয়ে দেখেন, সে অচৈতন্য অবস্থায় বিছানায় শুয়ে রয়েছে। তার কোন সাড়াশব্দ নেই। এরপর পিয়ালিদেবী অনন্যা কমপ্লেক্সের বাসিন্দা কংগ্রেসের প্রার্থী প্রসেনজিৎ পুইতুন্ডিকে ফোন করেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার বাড়িতে পৌঁছান। এই ঘটনা প্রসঙ্গে এদিন প্রসেনজিৎ পুইতুন্ডি বলেন, শনিবার রাতে এই এলাকার তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলরের মদদপুষ্ট গুন্ডারা দেবদীপ চট্টোপাধ্যায়ের ওপর হামলা করে। তাঁকে এতটাই নির্মমভাবে মারধর করা হয় যে, তাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
দেবদীপের পরিবার রাতে আমাকে খবর দেয়নি। এদিন সকালে ঘটনাটি জানতে পেরে আমি তার বাড়িতে যাই। তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। কংগ্রেস প্রার্থী আরো বলেন , তৃণমূল কংগ্রেসের গুন্ডারা দেবদীপকে এমন মারে ও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়, যার ফলে তাঁর মাথায় আঘাত লাগে। তাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। দেবদীপ চট্টোপাধ্যায়ের দেহ আসানসোল দক্ষিণ থানার (পিপি) সামনে রাখা হয়েছিলো। আমাদের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত হওয়া অপরাধীদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত দেহ সরানো হবে না বলে দাবি করে বিক্ষোভ চলে। পরে পুলিশ আশ্বাস দেয়।
তিনি আরো বলেন, আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে তিনজনকে শনাক্ত করেছি। তাদের নাম দিয়ে স্ত্রী লিখিত অভিযোগ দায়ের করবে। কারণ তার সামনে পুরো ঘটনাটি ঘটেছে। কংগ্রেস নেতা শাহ আলম বলেন , অনন্যা কমপ্লেক্সের বাসিন্দা দেবদীপ চট্টোপাধ্যায়কে শুক্রবার রাতে এলাকার তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ গুন্ডারা নৃশংসভাবে খুন করেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, টিএমসির গুন্ডারা এতটাই নির্ভীক হয়ে উঠেছে যে তারা কাউকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। তবে, তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে সিসিটিভিতে ধরা পড়া অপরাধীদের পুলিশ গ্রেফতার না করা পর্যন্ত দক্ষিণ থানায় আন্দোলন চলবে।
এ বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সম্পাদক ভি. শিবদাসন ওরফে দাসু বলেন , শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট দলকে ভোট না দেওয়ার কারণে আসানসোল শহরে কাউকে খুন করা হতে পারে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। তিনি আরো বলেন , কংগ্রেস দলের কোনো ইস্যু নেই। তাই তারা এই ধরনের মৃত্যুকে নিয়ে রাজনীতি করছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, এই মুহূর্তে এটা বলা যায় না যে পুলিশ তৃণমূল কংগ্রেসের নির্দেশে কাজ করছে।
কারণ বর্তমানে নির্বাচন কমিশন পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি বলেন, পুলিশ অভিযোগের ভিত্তিতে এই ঘটনার তদন্ত করবে এবং যে দোষী হবে তাকে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে।তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলর বলেন, ঘটনার কথা শুনেছি। এর সঙ্গে রাজনীতির বা আমার দলের কোন সম্পর্ক নেই। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে যা বুঝেছি, তাতে যে মারছিলো তাকে আমি চিনিনা। তবে যে, বাঁচাতে যায়, সে আমার দলের কর্মী।
তিনি আরো বলেন, পুলিশ যখন খবর পেয়ে রাতে সেখানে যায়, তখন পুলিশের উচিত ছিলো, আহত যুবককে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো ও মারধর করা যুবকদের আটক করা। আমি আশা করবো, পুলিশ ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের গ্রেফতার করবে।জানা গেছে, শুক্রবার রাতে দেবদীপ চট্টোপাধ্যায় মোটরবাইক করে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কোন জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যান। রাত দুটো নাগাদ তিনি ভগৎ সিং মোড় হয়ে অনন্যা কমপ্লেক্সে ফিরছিলেন। তখন ভগৎ সিং মোড়ে তার সঙ্গে কোন চারচাকা গাড়ির আরোহীদের বচসা হয়।
এরপর ঐ আরোহীরা তাকে পিছু ধাওয়া করে অনন্যা কমপ্লেক্সে আসে। তখন সেখানে কথা কাটাকাটি ও বাদানুবাদ হয়। তারপর তাকে সেখানে মারধরের ঘটনা ঘটে। আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশের ডিসিপি ( সেন্ট্রাল) ধ্রুব দাস বলেন, একটা ঘটনা ঘটেছে। এক যুবককে মারধর করা হয়েছে। পরে তার মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। রাজনীতির সঙ্গে এই ঘটনার কোন যোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে তদন্ত করা হচ্ছে। বেশ কয়েকজনকে আটক করে জেরা করা হচ্ছে। রবিবার সকালে আসানসোল জেলা হাসপাতালে মৃতদেহর ময়নাতদন্ত হবে।তবে, এই ঘটনা নিয়ে আসানসোলে রাজনৈতিক চাপানওতোর শুরু হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

