রানিগঞ্জে যুবক খুনের মামলা আসানসোল আদালতে দোষী সাব্যস্ত বন্ধুর সাড়ে ৯ বছর সশ্রম কারাদণ্ড
*বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, চরণ মুখার্জী ও রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* ২০১৭ সালের রানিগঞ্জের খোকন মাজি খুনে মামলায় দোষী সাব্যস্ত বিপেন রুইদাস ওরফে বিপিনকে দোষী সাব্যস্ত করে ৯ বছর ৬ মাস বা সাড়ে ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দিল আসানসোল আদালতের অতিরিক্ত দায়রা বিচারক। একই সঙ্গে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারক অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় মামলার শুনানি ও সাক্ষ্য দান শেষে বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণা করেন।













পুলিশ ও আদালত সূত্রে পাওয়া মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ রানিগঞ্জ থানার নিমচা এলাকার বাসিন্দা খোকন মাজির বাড়িতে তাঁর সঙ্গে বিপেন রুইদাসের বচসা হয়। অভিযোগ, সেই সময় বিপেন রুটি তৈরিতে ব্যবহৃত পাথরের ‘চাকি’ দিয়ে খোকন মাজির মাথার বাঁ দিকে আঘাত করেন।
গুরুতর আহত হয়ে খোকন মাটিতে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ।ঘটনার পরে পুলিশ বিপেনকে আটক করে। ঘটনাটি নিয়ে রানিগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ২ আগস্ট রানিগঞ্জ থানা ৩০২ ধারায় মামলা দায়ের করে। তদন্তের পর বিপেনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় চার্জ গঠন করা হয়।
২০২২ সালের জুন মাস থেকে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।এই মামলায় প্রসিকিউশন বা সরকারি আইনজীবী মোট ১৪ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেন। তাঁদের মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশকর্মী, তদন্তকারী আধিকারিক এবং চিকিৎসক ছিলেন। এই মামলায় কোনও ডিফেন্স সাক্ষী ছিল না।এই ঘটনার মূল সাক্ষী সুখদেব হেমব্রম আদালতে জানান, খোকন মাজির বাড়ি থেকে চিৎকার শুনে তিনি সেখানে যান। সেখানে খোকন মাজি ও বিপিনের মধ্যে বচসা দেখতে পান।
তাঁর দাবি, বিপিন পাথরের চাকি দিয়ে খোকনের মাথায় আঘাত করেন। এরপর খোকন মাটিতে পড়ে যান এবং তাঁর মাথা থেকে রক্তপাত শুরু হয়।অন্যান্য সাক্ষীদের বক্তব্যেও উঠে আসে, ঘটনার সময় খোকন ও বিপিন দু’জনেই মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। কয়েকজন সাক্ষী আদালতে জানান, বিপিন ঘটনাস্থল থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে ধরে ফেলেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
তবে মামলায় অস্ত্রের বর্ণনা নিয়ে সাক্ষীদের বক্তব্যে কিছু পার্থক্য ছিল। কোথাও সেটিকে ‘চাকি’, কোথাও ‘রোলিং পিন’ এবং কোথাও ‘শিল-নোড়া’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই বিষয়টি নিয়ে সওয়াল করেন অভিযুক্তের আইনজীবী। আদালত অবশ্য পর্যবেক্ষণ করে জানায়, বিভিন্ন সাক্ষীর বক্তব্যে নামের পার্থক্য থাকলেও সকলের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল অস্ত্রটি পাথরের তৈরি এবং রুটি তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। আরো উল্লেখ করা হয়, ঘটনাটি ২০১৭ সালে ঘটেছিল।
তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় প্রায় পাঁচ বছর পরে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সাক্ষীদের স্মৃতিতে কিছুটা পরিবর্তন বা অসঙ্গতি থাকা স্বাভাবিক। তাই আদালতের মতে, সেই অসঙ্গতির মাত্রা বিচার করতে হবে এবং শুধুমাত্র ছোটখাটো পার্থক্যের কারণে গোটাটা বাতিল করা যায় না।এই মামলার তদন্তকারী আধিকারিক বিজন সমাদ্দার বলেন, পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন ধৃতর দেখানো জায়গা থেকে ঘটনার তিনদিন পরে ৫ আগস্ট খোকন মাজির বাড়ি থেকে রক্তের দাগযুক্ত পাথরের চাকি উদ্ধার করা হয়েছিল।
জানা যায়, ঘটনার সময় খোকন মাজির বাড়িতে খোকন ও বিপিন ছাড়া অন্য কেউ ছিলেন না। বিপিন নিজেও ফৌজদারি কার্যবিধির ৩১৩ নং ধারায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বীকার করেন যে তিনি খোকনের সঙ্গে ছিলেন। দু’জনে মদ্যপান করেছিলেন। তবে খোকনের মাথায় কিভাবে আঘাত লাগল, তার কোনও ব্যাখ্যা তিনি দেননি।ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের দেওয়া রিপোর্ট ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, খোকন মাজির মাথায় যে আঘাত হয়েছিল, সেটিই তাঁর মৃত্যুর কারণ।
আদালত সেই মৃত্যুকে ‘অ্যান্টে-মর্টেম’ এবং ‘হোমিসাইডাল’ অর্থাৎ আঘাতজনিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে।আরো জানা যায়, খোকন ও বিপিন বন্ধু ছিলেন। তাঁরা সেদিন একসঙ্গে মদ্যপান করছিলেন। মদ্যপ অবস্থায় তাঁদের মধ্যে আচমকা বচসা শুরু হয়। সেই সময় বিপিন পাথরের চাকি দিয়ে খোকনের মাথায় আঘাত করেন। তার খোকনকে খুন করার নির্দিষ্ট পূর্বপরিকল্পিত উদ্দেশ্যের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে আদালত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০১ এবং ৩০৪ ধারার বিষয়টি বিবেচনা করে। আদালত জানায়, যদিও বিপিনের বিরুদ্ধে প্রথমে ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু বিচার চলাকালীন প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁকে ৩০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত ১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিপেন রুইদাস ওরফে বিপিনকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তার সাজা ঘোষণা করেন।এদিকে, সাজা ঘোষণার শুনানির সময় বিপিন আদালতের কাছে দয়া প্রার্থনা করেন।
তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে সহ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। তাঁর আইনজীবীও আদালতের কাছে তুলনামূলকভাবে লঘু সাজা দেওয়ার আবেদন জানান। অন্যদিকে, সরকারি আইনজীবী সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার আবেদন করেন। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনা ও সওয়াল-জবাব শেষে বিচারক বিপিনকে ৯ বছর ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করার নির্দেশ দেয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে বিচারকের নির্দেশে জানানো হয়েছে।

