১০ টি মামলায় মোট গ্রেফতার ১২১ কুলটির সাইবার অপরাধ চক্রের অন্যতম পান্ডা পুলিশের জালে
*বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের বিশেষ অভিযান ‘সাইবার প্রহার’-এ আরও সাফল্য মিললো। কুলটি থানার নিয়ামতপুর থেকে শুভম সাউ নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, নিয়ামতপুরে সক্রিয় সাইবার অপরাধ চক্রের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ যোগ থাকতে পারে। গ্রেফতারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই চক্রের আরও তথ্য জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারী অফিসাররা।এই প্রসঙ্গে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশের এসিপি (সাইবার) রাহুল পান্ডে বলেন, গত ১৭ আগস্ট থেকে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট এলাকায় সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে।













এখনও পর্যন্ত এই অভিযানে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত ১০টি মামলা রুজু হয়েছে। ওই মামলাগুলিতে মোট ১২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কমিশনারেট এলাকায় সাইবার অপরাধের দুটি গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলি হলো দুর্গাপুর এবং কুলটি থানার নিয়ামতপুর।বিশেষ করে নিয়ামতপুরকে কেন্দ্র করে তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পুলিশের হাতে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র নিয়ামতপুর থেকেই ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, এখানে সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে। এই নেটওয়ার্কের পিছনে থাকা মূল ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে তদন্ত চালানো হচ্ছে।পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্রে একাধিক স্তর রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজনকে ‘হায়ার ম্যানেজমেন্ট’ বা উপরের স্তরের সদস্য হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। অভিযোগ, তারা নতুন লোকজনকে এই অপরাধের কাজে যুক্ত করে, তাদের জন্য সিম কার্ড ও মোবাইল ফোনের ব্যবস্থা করে এবং সাইবার প্রতারণার বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়।
এরপর নিচের স্তরের সদস্যদের মাধ্যমে প্রতারণার কাজ পরিচালনা করা হয় বলে পুলিশের অনুমান। রাহুল পান্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, সদ্য গ্রেফতার হওয়া শুভম সাউ সাইবার অপরাধ নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ স্তরের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখত, কারা তাকে নির্দেশ দিত এবং তার মাধ্যমে অন্য কেউ এই চক্রে যুক্ত হয়েছিল কি না,এসব বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
শুভমের মোবাইল ফোন, যোগাযোগের তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট ও অন্যান্য আর্থিক নথি পরীক্ষা করে সাইবার অপরাধের টাকা কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় লেনদেন হয়েছে, তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করারও চেষ্টা চলছে।পুলিশের নজরে রয়েছে সাইবার অপরাধের মাধ্যমে তৈরি সম্পত্তিও।
তদন্তে যদি দেখা যায় যে, প্রতারণার টাকা ব্যবহার করে কোনও সম্পত্তি কেনা হয়েছে বা অন্য কোথাও বিনিয়োগ করা হয়েছে, তাহলে সেই সম্পত্তির বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। শুধু অভিযুক্তদের গ্রেফতার নয়, সাইবার অপরাধের আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াই পুলিশের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানা গিয়েছে।
এই নিয়ামতপুরের সাইবার অপরাধ চক্রের সঙ্গে ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া গ্যাংয়ের কোনও যোগ রয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। বিশেষ করে জামতাড়ার সঙ্গে কোনও সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।রাহুল পান্ডে আরো বলেন, আসানসোল ঝাড়খণ্ড সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এই ধরনের আন্তঃরাজ্য যোগাযোগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিয়ামতপুর ও আশপাশের এলাকার অনেকেরই ঝাড়খণ্ডে আত্মীয়স্বজন রয়েছে।
দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে।পুলিশের দাবি, গত কয়েক বছরে নিয়ামতপুর এলাকায় সাইবার অপরাধের ধরন ও নেটওয়ার্কে পরিবর্তন এসেছে। শুধুমাত্র ছোটখাটো প্রতারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংগঠিতভাবে এই অপরাধ পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কারা অর্থের জোগান দেয়, কারা প্রযুক্তিগত সহায়তা করে, কারা নতুন সদস্য সংগ্রহ করে এবং প্রতারণার টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় যায় পুরো চেইনটি চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে পুলিশ।শুভম সাউকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি তার যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে এই নেটওয়ার্কের আরও সদস্যের সন্ধান পাওয়া যায় কি না, সেই দিকেই এখন নজর তদন্তকারীদের। ‘সাইবার প্রহার’ অভিযান আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে বলে পুলিশের তরফে বলা হয়েছে।

