রেডিও থেকে স্মার্টফোনে মহালয়া শোনা , বদলেছে সময়, বদলেছে বাঙালির ভোরের আবেগ
*বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* বাঙালির দুর্গাপুজোর সূচনা যেন মহালয়ার ভোর থেকেই হয় । আকাশে তখনও অন্ধকারের রেশ, চারপাশে হালকা শীতের আমেজ, পাখির ডাক আর নিস্তব্ধ পরিবেশের মধ্যে হঠাৎ ভেসে আসতো রেডিওর পরিচিত সুর। ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর’—এই চেনা আবহের সঙ্গে বাঙালির আবেগ, স্মৃতি ও শারদীয় উৎসবের অনুভূতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। একসময় মহালয়ার ভোরে ঘুম থেকে উঠে রেডিও চালানো ছিল বহু বাঙালি পরিবারের অলিখিত নিয়ম।











আজ সেই ছবিতে এসেছে বড়সড় পরিবর্তন।একসময় মহালয়ার ভোরে ঘরে ঘরে রেডিও চালানোর দৃশ্য ছিল পরিচিত। অনেক পরিবারে আগের রাতেই রেডিওর ব্যাটারি পরীক্ষা করে রাখা হত। কোথাও বাড়ির উঠোনে, কোথাও বসার ঘরে, আবার কোথাও বারান্দায় রেডিওর পাশে জড়ো হতেন পরিবারের সদস্যরা। ছোট থেকে বড়, সবার অপেক্ষা থাকতো মহালয়া শোনার জন্য। রেডিওর আওয়াজ একটু কম বা বেশি হলে তা ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্বও থাকত বাড়ির কারও না কারও।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গম্ভীর, মায়াময় কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার মধ্যে ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি। চণ্ডীপাঠ, স্তোত্রপাঠ, সঙ্গীত এবং দেবী দুর্গার আবাহনের সেই সম্মিলিত পরিবেশ অনেকের মনে আজও অমলিন। তখন বিনোদনের মাধ্যম ছিল সীমিত। তাই রেডিওর একটি অনুষ্ঠানকে ঘিরেই তৈরি হত পারিবারিক মিলন, উৎসবের উত্তেজনা এবং শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি।
অনেকের কাছে মহালয়ার ভোর মানেই ছিল বাবা-মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙা। হালকা শীতের আমেজে চাদর গায়ে দিয়ে রেডিওর সামনে বসে পড়া। কোথাও চা তৈরি হতো, কোথাও বাড়ির বড়রা ছোটদের মহালয়ার তাৎপর্য বোঝাতেন। সেই ভোরের পরিবেশে ছিল না মোবাইলের নোটিফিকেশন। ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যস্ততা। ছিল শুধু একটি কণ্ঠ, কয়েকটি সুর এবং পুজো আসার গভীর আনন্দ।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রযুক্তি, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। একসময় যে অনুষ্ঠান শোনার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে রেডিওর সামনে বসতে হতো, এখন তা স্মার্টফোনে কয়েকটি ক্লিকেই শোনা যায়। ইউটিউব, বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন রেডিও এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে মহালয়ার অনুষ্ঠান পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের কাছে।বর্তমানে অনেকেই ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোনে মহালয়া চালিয়ে দেন।
কেউ ইয়ারফোনে শোনেন, কেউ বাড়ির স্মার্ট টিভিতে দেখেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহালয়ার ভিডিও ও শুভেচ্ছা বার্তা ভাগ করে নেন। কর্মসূত্রে অন্য শহর বা রাজ্যে থাকা বাঙালিরাও ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে নিজের বাড়ির মহালয়ার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।এতে একদিকে যেমন অনুষ্ঠান শোনার সুযোগ বেড়েছে, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে নতুন অভ্যাস।
আগে নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের সবাই একসঙ্গে অনুষ্ঠান শুনতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যেকে নিজের মতো করে, নিজের পছন্দের সময়ে অনুষ্ঠান শোনেন। একই বাড়িতে থেকেও কেউ মোবাইলে, কেউ টেলিভিশনে, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকেন। ফলে একসঙ্গে বসে একই অনুষ্ঠান শোনার সেই পুরনো পারিবারিক ছবিটি অনেক জায়গায় আর আগের মতো দেখা যায় না।তবে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে শুধুমাত্র ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে মহালয়ার অনুষ্ঠান নতুন প্রজন্মের কাছেও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে। যারা রেডিওর যুগ দেখেননি, তারাও এখন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনতে পারছেন। প্রবাসে থাকা বাঙালি, পড়াশোনা বা কাজের জন্য বাড়ি থেকে দূরে থাকা তরুণ-তরুণীরাও একই আবেগে মহালয়া পালন করতে পারছেন।কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়—মাধ্যম বদলালেও সেই সমষ্টিগত অনুভূতি কতটা বজায় থাকছে? আগে একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পরিবারের সবাই একই সময়ে জেগে উঠতেন।
এখন সহজলভ্যতার কারণে অনুষ্ঠান শোনা অনেক বেশি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু কখনও কখনও একই ঘরের মানুষের মধ্যেও দূরত্ব বাড়িয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মহালয়ার উপস্থিতি এখন যথেষ্ট চোখে পড়ার মতো। মহালয়ার শুভেচ্ছা, দেবী দুর্গার ছবি, ভিডিও, রিলস এবং নানা ধরনের ডিজিটাল পোস্টে ভরে ওঠে মানুষের মোবাইলের পর্দা। অনেকের কাছে দিনটি শুরু হয় অন্যদের শুভেচ্ছা জানিয়ে।
এই নতুন অভ্যাসের মধ্যেও উৎসবের আনন্দ রয়েছে, তবে সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে গিয়েছে দ্রুততার সংস্কৃতি। একটি পোস্ট দেখা, একটি শুভেচ্ছা পাঠানো কিংবা একটি ভিডিও ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই অনেক সময় সীমাবদ্ধ থাকছে উদযাপন।মহালয়া শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান শোনার দিন নয়। বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে এই দিনটির ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত তাৎপর্য রয়েছে। পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে মহালয়া জড়িত।
পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণের রীতি যেমন রয়েছে, তেমনই দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে বাঙালির মনে শুরু হয় শারদীয় উৎসবের প্রতীক্ষা।কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের একাংশের কাছে মহালয়া কখনও কখনও কেবল একটি ভিডিও, একটি শুভেচ্ছা বার্তা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার উপলক্ষ হয়ে উঠছে। অবশ্য সকলের ক্ষেত্রে এমন নয়। বহু তরুণ-তরুণী এখনও আগ্রহ নিয়ে মহালয়ার অনুষ্ঠান শোনেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান এবং এই ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এখানেই পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির প্রবীণ সদস্যরা যদি ছোটদের মহালয়ার গল্প, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এই দিনের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বোঝান, তাহলে প্রযুক্তির পরিবর্তন হলেও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব।যে বা যাঁরা রেডিওর যুগে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে মহালয়ার স্মৃতি অনেকটাই আবেগের। তাঁদের কাছে স্মার্টফোনে অনুষ্ঠান শোনা আর পুরনো রেডিওর সামনে বসে শোনার অভিজ্ঞতা এক নয়।
রেডিওর শব্দের সামান্য ওঠানামা, ভোরের নিস্তব্ধতা, পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসে থাকা এবং অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর পুজোর প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা, সব মিলিয়ে তৈরি হত এক বিশেষ পরিবেশ।আজ সেই রেডিও হয়তো বহু বাড়িতে আর নিয়মিত চালানো হয় না। কোথাও পুরনো রেডিওটি আলমারির কোণে পড়ে রয়েছে, কোথাও সেটি স্মৃতির বস্তু হয়ে উঠেছে। তবুও মহালয়ার ভোরে সেই পরিচিত কণ্ঠ শুনলে অনেকের মনে ফিরে আসে শৈশব, বাবা-মায়ের মুখ, পুরনো বাড়ি এবং একসঙ্গে কাটানো উৎসবের দিনগুলি।
এখনো এমন অনেক পরিবারও রয়েছে, যেখানে এখনও ভোরে রেডিও বা অন্য কোনও মাধ্যমে মহালয়ার অনুষ্ঠান চালিয়ে সবাই একসঙ্গে বসেন। অর্থাৎ পরিবর্তন সর্বত্র একরকম নয়। কোথাও পুরনো রীতি বজায় রয়েছে, কোথাও নতুন মাধ্যম পুরনো অভ্যাসের জায়গা নিয়েছে।প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়েও বাঁচুক ঐতিহ্য।
তাই সময়কে পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আর প্রযুক্তির অগ্রগতিকে অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল মাধ্যম মানুষের জীবনে সুবিধা এনেছে। মহালয়ার অনুষ্ঠান এখন আরও সহজে, আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছে। তাই রেডিওর যুগের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করতে গিয়ে নতুন প্রজন্মকে দোষারোপ করারও কোনও কারণ নেই।বরং প্রয়োজন, প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করার পাশাপাশি উৎসবের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকটিকেও গুরুত্ব দেওয়া।
মহালয়ার সকালে পরিবারের সদস্যরা যদি কিছুটা সময় একসঙ্গে বসে অনুষ্ঠান শোনেন, ছোটদের এই দিনের তাৎপর্য বোঝান এবং পুরনো স্মৃতিগুলি ভাগ করে নেন, তাহলে আধুনিকতার মধ্যেও ঐতিহ্য বেঁচে থাকবে।কারণ মহালয়ার আসল সৌন্দর্য শুধু রেডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আবার শুধু স্মার্টফোনের পর্দাতেও নয়। এর আসল শক্তি রয়েছে মানুষের আবেগে, স্মৃতিতে, সংস্কৃতিতে এবং একসঙ্গে উৎসবকে অনুভব করার মধ্যে।
একসময় মহালয়ার ভোরে রেডিওর সামনে বসে যে বাঙালি দেবী দুর্গার আগমন অনুভব করতেন, আজও সেই বাঙালিই হয়তো হাতে স্মার্টফোন নিয়ে একই অনুষ্ঠান শুনছেন। মাধ্যম বদলেছে, সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা। কিন্তু মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে শারদীয় আবাহন শুনে মন আজও পুজোর আনন্দে ভরে উঠে। তাই বলা যায়,ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তার প্রকাশের ধরন বদলেছে। এখন শুধু দরকার, সেই আবেগকে মোবাইলের পর্দা থেকে আবার পরিবারের সবার সঙ্গে সম্মিলিত আনন্দে ফিরিয়ে আনার আবহ তৈরি করা।


