ASANSOL

মহালয়ার দিনেই হয় দুর্গাপুজো ও বিসর্জন, বার্নপুরের কালীকৃষ্ণ আশ্রমে ৮৭ বছরের ঐতিহ্য দেখতে ভক্তদের ভিড়

*বেঙ্গল মিরর, বার্নপুর, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* মহালয়ার মধ্যে দিয়ে পিতৃপক্ষের অবসান হয়। সূচনা হয় দেবীপক্ষের। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরে যখন রাজ্যের সর্বত্র শুরু হয় প্রস্তুতি, তখন পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলের হিরাপুর থানার বার্নপুরের ধেনুয়া গ্রামে দামোদর নদীর তীরে কালীকৃষ্ণ আশ্রমে মহালয়ার দিনেই হয় একদিনের দুর্গাপুজো। সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান মেনে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী থেকে দশমী চারদিনের পুজো একদিনের মধ্যেই সমস্ত রীতি মেনে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়। সবশেষে এদিন প্রতিমা বিসর্জন করা হয় এই আশ্রমের পুকুরে।

ব্যতিক্রমী এই পুজো ‘আগমনী দুর্গাপুজো’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং অনন্য পুজোর রীতির কারণে প্রতি বছর মহালয়ার দিন বহু ভক্তের সমাগম হয় এখানে।সাধারণত মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হলেও দুর্গাপুজোর মূল আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয় ষষ্ঠী থেকে। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমীর বিভিন্ন রীতি মেনে কয়েক দিন ধরে চলে দেবী দুর্গার আরাধনা।

কিন্তু বার্নপুরের কালীকৃষ্ণ আশ্রমের এদিনের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে মহালয়ার দিনেই নির্দিষ্ট রীতি মেনে একে একে সম্পন্ন করা হয় পুজোর সমস্ত আচার। পুজো-অর্চনা থেকে শুরু করে বিসর্জন, সবকিছুই শেষ হয় একই দিনে।ফলে অন্য জায়গায় যখন দুর্গোৎসবের আনন্দে মেতে উঠার প্রস্তুতি চলে, তখন এই আশ্রমে দেবীর আরাধনা সম্পন্ন করে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পুজোর সমাপ্তি ঘটে।

এই ব্যতিক্রমী রীতিই কালীকৃষ্ণ আশ্রমের দুর্গাপুজোকে অন্যান্য পুজোর থেকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।কালীকৃষ্ণ আশ্রমের আগমনী দুর্গাপুজোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল প্রতিমার গঠন ও দেবদেবীদের উপস্থিতি। প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমায় মা দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে দেখা যায়। কিন্তু এই আশ্রমের পুজোয় সেই পরিচিত ছবির পরিবর্তে মা দুর্গার সঙ্গে পূজিত হন তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়া।

এই স্বতন্ত্র প্রতিমার রূপ এবং পুজোর বিশেষ রীতি দেখতে প্রতি বছর আশ্রমে আসেন বহু মানুষ। ভক্তদের কাছে এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরম্পরা। সারাদিন ধরে সনাতন রীতিনীতি মেনে চলে পুজো-অর্চনা। ভক্তরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন পরিবার, সমাজ এবং সকলের মঙ্গল কামনায়।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৩৭ সালে তেজানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক সাধক হিরাপুর থানার বার্নপুরের ধেনুয়া গ্রামে দামোদর নদীর তীরে কালীকৃষ্ণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।

নির্জন নদী তীরবর্তী এই আশ্রম ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষের কাছে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।স্থানীয়দের দাবি, ১৯৭৯ সালে দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর তেজানন্দ ব্রহ্মচারী এই বিশেষ ‘আগমনী দুর্গাপুজো’ শুরু করেন। সেই সময় থেকে মহালয়ার দিনেই দুর্গাপুজোর সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার রীতি চলে আসছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পরম্পরা বজায় রয়েছে।

যদিও পুজোর সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্বপ্নাদেশের কাহিনি, ভক্তদের কাছে তা গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থার বিষয়।মহালয়ার দিন ভোর থেকেই এই বিশেষ পুজোকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে উৎসাহ দেখা যায়। দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে দেবী দুর্গার আরাধনা এবং একই দিনে বিসর্জনের এই রীতি দেখতে আশ্রমে আসেন বহু মানুষ। পুজোর প্রতিটি পর্বে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও ভক্তির পরিবেশ তৈরি হয়।স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে মহালয়ার দিনেই এভাবে একদিনের মধ্যে দুর্গাপুজোর সমস্ত আচার সম্পন্ন করার রীতি অত্যন্ত বিরল।

তাঁদের মতে, অসমের কয়েকটি স্থানেও ‘আগমনী দুর্গাপুজো’ অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই ধরনের পুজোর বিস্তৃতি ও সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া না যাওয়ায় একে রাজ্যের একমাত্র পুজো বলে দাবি করার পরিবর্তে বিরল ঐতিহ্যবাহী পুজো বলেই উল্লেখ করছেন স্থানীয়রা।দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির কাছে কয়েক দিনের উৎসব, নতুন পোশাক, আনন্দ, মণ্ডপ পরিক্রমা এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো। সেই পরিচিত ছবির বাইরে হীরাপুরের কালীকৃষ্ণ আশ্রমের আগমনী দুর্গাপুজো তুলে ধরে অন্য এক ধর্মীয় পরম্পরার কথা।

এখানে সময়ের হিসাবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বিশ্বাস, সাধকের স্মৃতি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পুজোর বিশেষ রীতি।পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনার পবিত্র মুহূর্তে দেবী দুর্গার আরাধনা করে একই দিনে বিসর্জন দেওয়ার এই প্রথা এই আশ্রমে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে ভক্তদের সমাগম এবং স্থানীয় মানুষের শ্রদ্ধা এই আশ্রমের পুজোকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।একদিকে দামোদরের শান্ত নদী তীর, অন্যদিকে আশ্রমের আধ্যাত্মিক পরিবেশ।

সব মিলিয়ে মহালয়ার দিন কালীকৃষ্ণ আশ্রমে তৈরি হয় এক স্বতন্ত্র ধর্মীয় আবহ। প্রচলিত দুর্গাপুজোর রীতির বাইরে দাঁড়িয়ে একদিনের পুজো থেকে বিসর্জন সম্পন্ন করার এই ঐতিহ্যই আসানসোলের কালীকৃষ্ণ আশ্রমকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে বলে এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *