মহাষষ্ঠীতে এক বেলার স্বাধীনতা চার দেওয়ালের বাঁধন ছেড়ে পুজোর আলোয় আসানসোলের স্ব-শক্তি সদনের মেয়েরা
*বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* বছরভর বলতে গেলে চার দেওয়ালের ভেতরে থাকা। বাইরের পৃথিবীটা তাদের কাছে যেন জানালার ফাঁক দিয়ে আসা এক টুকরো আকাশের মতো। কিন্তু আজকের দিনটা তাদের কাছে একেবারে আলাদা। আজ শুক্রবার মহাষষ্ঠী। মায়ের বোধন। সব অপেক্ষার অবসান শেষে দুর্গাপূজোর সূচনা। আর এইদিনই আসানসোলের ইসমাইলের স্ব-শক্তি সদন হোমের দরজা খুলে গেছে। এই হোমের বাসিন্দা সমাজের চোখে অনাথ, অসহায়, দুঃস্থ কিছু নারী। কিন্তু এদিনের জন্য জন্য তারা শুধুই কয়েকজন মেয়ে। যারা অন্যদের মতো মন্ডপ ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে।













এই একটা দিনই তাদের ছুটি। কাল থেকে অন্য পাঁচটা দিনের মতো আবার নিরাপত্তার বেড়াজালে থাকা জীবন। তাই এই একদিনের মধ্যেই তাদের দেখে নিতে হবে গোটা দুর্গাপুজোর সব আনন্দ। সেই আনন্দটুকু জমিয়ে রাখতে হবে বাকি চারটে দিনের জন্য।তাই এদিন সকাল হতেই সাজো সাজো রব। মীনা কুমারী, তাপসী, আয়েশা, মামনি, রাইমনি, মধু, বর্ণালী, মেহেরুন্না, লক্ষ্মী, আশা।

নাম সবার আলাদা। পদবী আলাদা। ধর্মও আলাদা। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ সাঁওতাল সম্প্রদায়ের। শুক্রবার বিকেল চারটে নাগাদ হোম থেকে বাসে করে বেরোনোর সময় তাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ ছিল না। প্যান্ডেল, প্রতিমা ও আলোয় সবার চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময়।আসানসোলের হোম থেকে ২৫ জনকে নিয়ে যাত্রা শুরু হয়ে প্রথমে বার্নপুর যাওয়া। তারপর বার্নপুর জুড়ে তাদের বাস ছুটে চলল একটার পর একটা মন্ডপের দিকে। ঠাকুর দেখে মেয়েদের হাসির শব্দে ভরে উঠল পুজো মণ্ডপগুলো।
তারাই প্রমাণ করে দিল, উৎসবের কোনো ধর্ম হয় না।টানা দশ বছর ধরে এই মেয়েদের মুখে এই হাসিটা ফুটিয়ে চলেছেন একজন মানুষ। তিনি হলেন বিশ্বনাথ মিত্র। আসানসোলের ইস্টার্ন রেলওয়ে স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও ইওর অর্গানাইজেশন হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের সচিব। তিনিই এই পুরো পরিকল্পনার কারিগর।
তিনি অনেকটা অভিভাবকের মতো আগলে রেখে মেয়েদের ঘোরান।তাঁর এই কাজে প্রতিবারের মতো এবারও হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আসানসোল পুরনিগমের প্রাক্তন মেয়র পারিষদ গুরুদাস ওরফে রকেট চট্টোপাধ্যায়। ঠাকুর দেখার জন্য মিনিবাসের বন্দোবস্তো করে দিয়েছেন তিনি। আর মাঝের খাওয়া-দাওয়া যেমন জল, মিষ্টি, সিঙ্গারা ও টিফিনের ব্যবস্থা করেছে আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় থাকা প্রবাসী বাঙালি, বারাবনির ভূমিপুত্র পল উপাধ্যায়।
মেয়েদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন হোমের সুপার সেরিনা মণ্ডল ও প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা রঞ্জনা মুন্সী।বার্নপুর ও আসানসোলের একাধিক মণ্ডপের ঠাকুর দেখার পালা এসে শেষ হয় আসানসোলের ট্রাফিক কলোনিতে।ট্রাফিক কলোনি পুজো কমিটির তরফে বিশ্বনাথ মিত্র, সেরিনা মণ্ডল এবং রঞ্জনা মুন্সীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। ট্রাফিক কলোনি কমিটির সেক্রেটারি রাম প্রসন্ন ঘোষ বলেন, “স্ব-শক্তি হোমের মেয়েরা প্রতিবছর এখানে আসেন।
ওদের উপস্থিতি পুজো মণ্ডপের আনন্দোৎসবকে আরও আলোকিত করে তোলে। শেষে প্রতিবারের মতো ট্রাফিক কলোনি কমিটির পক্ষ থেকে প্রত্যেকের জন্য রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।এখান থেকে এবারের মতো মামনি, রাইমনিদের হোমের চার দেওয়ালে ফিরে যাওয়ার পালা। পরের বছরের এই দিনটার জন্য দিন গোনা শুরু। মাঝে পড়ে থাকবে আজকের প্রতিমা দর্শন, মণ্ডপসজ্জা, মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার অনাবিল সুখস্মৃতি ও আনন্দ।

