ASANSOL

আসানসোলে গাড়ুই নদীর সংস্কার মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে উদ্যোগী হতে আর্জি সমাজকর্মী শিক্ষকের

. *বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* আসানসোলের গাড়ুই নদীর সংস্কার নিয়ে উদ্যোগী হতে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন এবং নারী ও শিশু কল্যান দপ্তরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে খোলা চিঠি দিলেন আসানসোলের বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক সমাজকর্মী বিশ্বনাথ মিত্র। চিঠিতে তিনি বলেন, আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, আসানসোলের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা হল রেলপারের অনুন্নয়ন। যার মধ্যে গাড়ুই নদী জনিত সমস্যা হলো এর প্রধান কারণ।বর্ষাকালে প্রতিবছরই সামান্য বৃষ্টি হলেই গাড়ুই নদী উপচে রেলপারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত করে দেয়। হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক মানুষের প্রাণহানিও ঘটে।

অথচ এই বন্যা প্রতিরোধ করতে আসানসোল পুরনিগম, পশ্চিম বর্ধমান জেলা প্রশাসন, কিংবা রাজ্য সরকার নদী সংস্কারে হাত দিলেও তা কি কারণে বারবার ব্যর্থ হয়, তা আমাদের জানা নেই। এই গাড়ুই নদীর বন্যার মূল কারণ। নদীর সংস্কার না হওয়া ফলে বর্ষার অতিরিক্ত জল নদীপথে স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে না পেরে দুই কূল ভাসিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে নদীর দুইধারে অবৈধ নির্মাণ নদীকে তার স্বাভাবিক পথে চলতে বাধা দিচ্ছে। মূলত ঝিংড়ি মহল্লা এবং কসাই মহল্লা দিয়ে প্রবাহিত এই নদীর দুইপাশে কোথাও কাঁচা, কোথাও পাকা গাঁথনি বা কংক্রিটের অবৈধ নির্মাণ নদীকে মাঝে মাঝেই গ্রাস করেছে।

তিনি আরো বলেন, এছাড়াও ড্রেজিংয়ের অভাবে আসানসোলের যাবতীয় বর্জ্য পদার্থ বছরের পর বছর নদীর তলদেশে জমে নদীকে স্থবির করে তুলেছে। কাল্লা মোড়ের কাছে গাড়ুই নদীর উপরে ব্রিটিশ আমলের একটি বিশাল পাথরের পিলার এমনভাবে রয়েছে যে নদীর জল সেখানে বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়। এর অপসারণ নদীর স্বার্থে খুবই জরুরি। গাড়ুই নদীতে আসানসোলের তিন/চারটি বড় নর্দমার জল মেশে। এগুলি আসলে হাজার বছর আগে গাড়ুই নদীর উপনদী ছিল।

এই নর্দমাগুলির আমূল সংস্কার দরকার। কারণ এই নর্দমার জল উপচে পড়ে কল্যাণপুর ও রেলপার এলাকা বছরের পর বছর প্লাবিত করে। আপকার গার্ডেন সংলগ্ন, স্টেশন সংলগ্ন, বেলডাঙা সংলগ্ন নর্দমাগুলি এর মধ্যে অন্যতম। বৃষ্টির জল সরাতে নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন খুবই প্রয়োজন। প্রাক্তন মন্ত্রী মলয় ঘটক, প্রাক্তন দুই মেয়র তাপস বন্দোপাধ্যায় জিতেন্দ্র তেওয়ারি ও পরে বর্তমান মেয়র বিধান উপাধ্যায় নদী সংস্কারে উৎসাহ দেখালেও কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি।বিশ্বনাথবাবু আরো বলেন, এই নিয়ে বারবার নাগরিক প্রতিবাদ হয়েছে।

বামফ্রন্ট জমানায় মেয়র তাপস রায়ের সময়ে এই বিষয়ে সমস্যার সমাধানের জন্য বারবার সোচ্চার হন। পরে সরব হয়েছিলেন বিধায়ক ডাঃ পি আর মুখোপাধ্যায়, সাংবাদিক বিশ্বদেব ভট্টাচার্য ও পরিবেশবিদ সাহিত্যিক জয়া মিত্র। একাধিক সময়ে তারা পরামর্শ দিয়েছিলেন বিদায়ী শাসক দলকে। এইসব পরিবেশবিদদের চাপেই মূলত ব্লু ফ্যাক্টরির নোংরা বিষাক্ত বর্জ্যজল গাড়ুই নদীতে আসা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়।

এ ছাড়াও নদী গবেষক সুরজিৎ সুলেখাপুত্র, আসানসোল উত্তরের বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় , রাজনীতিবিদ প্রসেনজিৎ পুইতুন্ডী, অবসরপ্রাপ্ত রেল কর্মচারী মলয় মজুমদাররা বিভিন্ন সময়ে নদী সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। আপনি বন্যারোধে নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা করলে এই বিষয়ে উনাদের সকলের সহযোগিতা নিতে পারেন। তিনি আরো বলেন, কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ নয়। গাড়ুই নদীকে কার্যত ‘হত্যা’ করেছে সৃষ্টিনগর নামক বিশাল প্রজেক্ট। সৃষ্টিনগরের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও আবাসন নগরী এবং সেন্ট্রাম মল নির্মাণের স্বার্থে গাড়ুই নদীকে বলি হতে হয়েছে।

এই নদী এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে কল্যাণপুরে প্রবেশ করত। উন্নয়নের নামে নদীটিকে শুধু ছোট করা হয়নি। এই অঞ্চলে নদীর দুই ধার কংক্রিট দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়েছে। ফলে নদী হারিয়েছে তার প্রাকৃতিক তটভূমি। বর্ষার অতিরিক্ত জল মাটির মধ্যে প্রবেশ করতে পারছে না। যার ফলস্বরূপ কল্যাণপুরও গাড়ুই নদীর জলে প্রতিবছর প্লাবিত হয়। তাই কল্যাণপুরের পর থেকেই ঝিংড়ি মহল্লা বা কসাই মহল্লা অঞ্চল, গোপালপুর ইত্যাদি স্থানে নদীর ধারে অবৈধ দখলদারি যেমন উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। তেমনি সৃষ্টিনগরে কেন এবং কার স্বার্থে গাড়ুই নদীকে নির্মমভাবে গলা টিপে রুগ্ন করে দেওয়া হল, তারও তদন্ত হওয়া উচিত।

কাজটি কঠিন। কারণ ঝিংড়ি মহল্লা, কসাই মহল্লা কিংবা ডিপু পাড়ার মতো এখানে সাধারণ মানুষ থাকে না। প্রভাবশালী মানুষদের প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে গেলে হয়তো কারোর কারোর কাছে বাধাপ্রাপ্ত হতে পারেন।আসানসোলবাসীর তরফে আপনার কাছে বিনীত আবেদন, প্রশাসন ও আসানসোল পুরনিগমের যৌথ উদ্যোগে গাড়ুই নদীকে তার নিজের জায়গায় ফিরিয়ে দেবার জন্য বৈজ্ঞানিকসম্মত পরিকল্পনা ও তার সফল রূপায়ণে উদ্যোগী হোন। নদীর দুইপাশে যে অবৈধ নির্মাণ গড়ে উঠেছে তা সমূলে উৎপাটন দরকার। প্রয়োজন অবশ্যই বড় ধরনের ড্রেজিং। আপনার কাজের প্রতি, সদিচ্ছার প্রতি দলমত নির্বিশেষে আসানসোলবাসীর একশো শতাংশ বিশ্বাস আছে।

আশা রাখি, আপনি নদী সংস্কারে উদ্যোগী হয়ে এই “বঞ্চিত” নদীকে তার জায়গায় ফিরিয়ে দেবেন এবং প্রতিবছর বন্যার হাত থেকে আসানসোল উত্তর বিধানসভার একটা বিশাল অংশের মানুষকে রেহাই দিতে সক্ষম হবেন। তবে, এর সঙ্গে বলি, মানবিকতার স্বার্থে নদীর দুই ধারে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও মাথায় রাখা উচিত। অন্যদিকে, মন্ত্রী হওয়ার পরে অগ্নিমিত্রা পাল বলেছেন, রাজ্য সরকার আসানসোল নিয়ে পরিকল্পনা নিচ্ছে। আস্তে আস্তে তা করা হবে।

Social Share or Summarize with AI

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *