ধুলোর চাদরে দমবন্ধ সবুজ! আসানসোলে গাছ বাঁচাতে কড়া বার্তা মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের, ওভারলোডিং ও দূষণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আশ্বাস
*বেঙ্গল মিরর, আসানসোল, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* একদিকে পরিবেশ রক্ষায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে সবুজায়নের প্রচার হচ্ছে। অন্যদিকে, আসানসোলের সেনরেলে রোড বা বিবেকানন্দ সরণীতে দেখা যাচ্ছে তার সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। রাস্তার ধারে লাগানো একের পর এক গাছ ধুলোর মোটা আস্তরণে ঢেকে কার্যত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। গাছের পাতায় হাত বুলালেই হাত কালো হয়ে যাচ্ছে। যে গাছ মানুষের জন্য অক্সিজেন জোগাবে, পরিবেশকে সবুজ রাখবে, সেই গাছই আজ ধুলোর স্তূপে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখে।














এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষ ও স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ফ্লাই অ্যাশের দূষণ, কয়লা ও আয়রন ওর, ভারী ট্রাকের অবাধ যাতায়াত এবং নিয়মিত রাস্তায় জল না ছিটানোর ফলে গোটা এলাকা ধুলোর রাজ্যে পরিণত হয়েছে। একটি ট্রাক গেলেই চারদিক ধোঁয়াশার মতো ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে। সেই ধুলো শুধু গাছের পাতায় নয়, দোকানের খাবার, বাড়িঘর, মানুষের শরীর এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে মিশে প্রতিদিন নতুন স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন, গাছের পাতায় এতটাই ধুলো জমেছে যে সবুজ রং প্রায় দেখা যায় না। বহু গাছের পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ছে, নতুন পাতা গজানোও প্রায় বন্ধ। পরিবেশপ্রেমীদের মতে, পাতার উপর অতিরিক্ত ধুলো জমে গেলে সূর্যের আলো গ্রহণ ও শালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে গাছ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একসময় মরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।বাসিন্দাদের অভিযোগ, একসময় নিয়মিত রাস্তা ধোয়া ও জল ছিটানোর ব্যবস্থা থাকলেও এখন তা কার্যত বন্ধ। রাস্তা পরিষ্কার বা ঝাড়ু দেওয়ার কাজও প্রায় হয় না।
ফলে প্রতিদিন ধুলোর স্তর আরও ঘন হচ্ছে। অথচ সেনরেলে রোড আসানসোল শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, কর্মজীবী এবং অসংখ্য যানবাহন এই রাস্তা ব্যবহার করেন।স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, আর কত প্রতিবাদ করব? কাকে জানাব? বছরের পর বছর ধরে একই অবস্থা। আমরা ধুলোর মধ্যে বেঁচে আছি। অন্তত বিষয়টা সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে, এটাই আমাদের কাছে বড় ভরসা।
আরেক বাসিন্দা বলেন, গাছগুলোকে বাঁচানোর জন্য লাগানো হয়েছিল, কিন্তু এখন গাছই বাঁচবে না। চারদিকে শুধু ধুলো আর ধুলো। দোকানের খাবার নষ্ট হচ্ছে, বাড়িঘর নোংরা হয়ে যাচ্ছে, মানুষের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী তথা আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি রবি বলেন, আসানসোল শিল্পাঞ্চলে ওভারলোডিং, রাস্তার বেহাল দশা, কয়লার গুঁড়ো এবং দূষণ নিয়ে একাধিক অভিযোগ আমার নজরে এসেছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে।মন্ত্রী বলেন, বর্ষাকালে স্থায়ীভাবে রাস্তা মেরামত করা সম্ভব নয়। তবে সাধারণ মানুষের চলাচলে যাতে অসুবিধা না হয়, তার জন্য আপাতত অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্ষা শেষ হলেই স্থায়ীভাবে রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু করা হবে।অগ্নিমিত্রা পাল স্পষ্টভাবে জানান, অতিরিক্ত ওভারলোডিংয়ের ফলে শুধু রাস্তার ক্ষতিই হচ্ছে না, কয়লা ও আয়রন অরের গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
এমনকি সরকারের লাগানো গাছও ধুলোয় ঢেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।তিনি বলেন , রেলের সাইডিং থেকে বের হওয়া কয়লা, বালি বা আয়রন অর বহনকারী সমস্ত গাড়িকে বাধ্যতামূলকভাবে ত্রিপল বা কভার দিয়ে মাল ঢেকে পরিবহন করতে হবে। এ বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে ইতিমধ্যেই আলোচনা হয়েছে। ঢাকা বা কভার ছাড়া কোনও গাড়িকে চলতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি, আইনে নির্ধারিত সীমার বেশি মাল বহন করলে ওভারলোডিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।মন্ত্রী আরও কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, কাটমানি, তোলাবাজি বা বেআইনি কোনও কাজ কাউকে করতে দেওয়া হবে না।
কেউ যদি এই ধরনের অভিযোগ করেন বা প্রমাণ দেন, তাহলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে সেনরেলে রোডের বাসিন্দাদের দাবি, নেতা মন্ত্রীদের মুখে শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাই। নিয়মিত রাস্তায় জল ছিটানো, রাস্তা পরিষ্কার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ওভারলোডিং বন্ধ এবং রাস্তার ধারের গাছগুলিকে বাঁচাতে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছেন তাঁরা।পরিবেশবিদদের মতে, গাছ কথা বলতে পারে না। কিন্তু ধুলোর চাদরে ঢেকে একের পর এক গাছের নীরব মৃত্যু আসানসোল শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ সংকটের এক গভীর সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে। এখন দেখার, প্রশাসনের ঘোষিত পদক্ষেপ বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং সেনরেলে রোডের দমবন্ধ সবুজ আবার কতটা প্রাণ ফিরে পায়।


