অবৈধ কয়লা খনন মামলায় লালার বিরুদ্ধে ইডির বড়সড় অভিযান , ১৩৬ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
বেঙ্গল মিরর, আসানসোল ও পুরুলিয়া, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* বাংলায় সাড়া ফেলে দেওয়া অবৈধ কয়লা খনন ও পাচার মামলায় মূল অভিযুক্ত অনুপ মাঝি ওরফে ‘লালা’ এবং তাঁর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ফের বড় পদক্ষেপ করলো কেন্দ্রীয় এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি । অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন (পিএমএলএ), ২০০২-এর অধীনে ১৩৬.৪৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি অস্থায়ীভাবে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ জারি করেছে তদন্তকারী সংস্থা। এই পদক্ষেপের ফলে মামলায় এখনও পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির মোট মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১৫.০৮ কোটি টাকা।ইডি সূত্রে জানা গেছে, এর আগে বিভিন্ন পর্যায়ে এই মামলায় ৬৭৮.৬৪ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। সম্প্রতি ১৩৬.৪৪ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশের পর মোট অঙ্ক বেড়ে ৮১৫.০৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অবৈধ কয়লা কারবারের আর্থিক লেনদেন এবং সেই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।











এই মামলার তদন্তে ইডির দাবি, ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড বা ইসিএলের লিজ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ কয়লা অবৈধভাবে উত্তোলন ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। এই বেআইনি কয়লা কারবারের নেতৃত্বে ছিলেন পুরুলিয়ার অনুপ মাঝি ওরফে লালা। অভিযোগ, অবৈধভাবে উত্তোলিত কয়লা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার শিল্পাঞ্চলের কারখানা ও শিল্প সংস্থার কাছে নগদ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হত।তদন্তকারী কেন্দ্রীয় এজেন্সির আরো দাবি, এই চক্রকে স্থানীয় প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি ও আধিকারিকের মদত ছিল। তবে এই দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের বক্তব্য বা আইনি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি।


ইডির তদন্ত অনুযায়ী, অবৈধ কয়লা বিক্রি থেকে সংগৃহীত অর্থের উৎস আড়াল করতে একাধিক শেল কোম্পানি ব্যবহার করা হয়েছিল। অভিযোগ, লালা তাঁর পরিবারের সদস্য, কর্মচারী এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী গুরুপদ মাঝির নামে একাধিক সংস্থা তৈরি করেছিলেন। ওই সংস্থাগুলির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ লালার হাতেই ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।অভিযোগ, নগদ লেনদেনের প্রকৃত উৎস ও সুবিধাভোগীদের পরিচয় গোপন করতে বিভিন্ন শেল কোম্পানির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অর্থ ঘোরানো হত। এই পদ্ধতিতে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থকে বৈধ আয়ের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ইডির দাবি।সম্প্রতি হওয়া অভিযানে পর্যটন ও রিয়েল এস্টেট ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা সম্পত্তির উপর বিশেষ নজর দিয়েছে ইডি। বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তির তালিকায় রয়েছে পুরুলিয়া জেলার ‘গ্রহ পঞ্চকোট ইকো ট্যুরিজম’ এবং বাঁকুড়া জেলার ‘বিহারীনাথ ইকো ট্যুরিজম’ রিসর্ট।
পাশাপাশি কলকাতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি, বিভিন্ন শেল কোম্পানির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ, মাঝি পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সংস্থার শেয়ার এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগও এই পদক্ষেপের আওতায় এসেছে বলে জানা গিয়েছে।এই অবৈধ কয়লা কারবারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী, সহযোগী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির পরিচয় খুঁজে বার করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে ইডি। এই আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে আর কারা যুক্ত রয়েছেন, তা জানতে বিভিন্ন লেনদেন ও সম্পত্তির নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।ইডির এই পদক্ষেপের পরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে পশ্চিম বর্ধমান জেলার কয়লা শিল্পাঞ্চল সহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ কয়লা কারবারের বিষয়টি। রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর ইডির এই পদক্ষেপ অবৈধ কয়লা উত্তোলন ও পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের। তবে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার এই পদক্ষেপের ফলে অবৈধ কয়লা কারবার পুরোপুরি বন্ধ হবে কি না, তা নির্ভর করবে তদন্তের অগ্রগতি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির ধারাবাহিক পদক্ষেপের উপর।প্রসঙ্গতঃ, আসানসোলে সিবিআই আদালতে এই কয়লা পাচার মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।

