নতুন রূপে লক্ষ্মীমন্দির, কোজাগরী পূর্ণিমায় আজও অটুট ঐতিহ্য ! কুলটির ‘ভূতের গ্রামে ’ একদিনের জন্য ফেরে প্রাণ
*বেঙ্গল মিরর, কুলটি, রাজা বন্দোপাধ্যায়ঃ* কোথাও ভেঙে পড়েছে বাড়ির দেওয়াল, কোথাও ধসে গিয়েছে ছাদের একাংশ। পরিত্যক্ত বাড়ির আনাচকানাচে জন্মেছে আগাছা, জরাজীর্ণ বসতভিটেগুলিতে স্পষ্ট সময়ের ক্ষতচিহ্ন। চারপাশে নিস্তব্ধতা, জনবসতির চেনা কোলাহল নেই, নেই প্রতিদিনের ব্যস্ততা। অথচ এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই এক অন্য ছবি তুলে ধরছে পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলের কুলটি বিধানসভার বেনা গ্রামের লক্ষ্মীমন্দির। একসময় সাধারণ চেহারার এই মন্দির বর্তমানে নতুন রূপে সেজে উঠেছে। নকশাদার রঙিন টাইলস, উজ্জ্বল নীল দরজা-জানালা এবং সুন্দর সাজসজ্জায় মন্দিরটি এখন গ্রামের অন্যতম আকর্ষণ।













চারপাশের ভগ্নপ্রায় বাড়িঘরের সঙ্গে মন্দিরের এই নতুন রূপ যেন এক গভীর বার্তা দেয়। জনবসতি হারিয়ে যেতে পারে, সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে একটি জনপদের চেহারা, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও শিকড়ের টান এত সহজে মুছে যায় না।কোজাগরী পূর্ণিমা উপলক্ষে বেনা গ্রামের এই লক্ষ্মীমন্দিরকে ঘিরে ফিরে আসে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্য। বছরের অধিকাংশ সময় প্রায় নিস্তব্ধ থাকা গ্রামে পুজোর সময় পুরনো বাসিন্দাদের একাংশ ফিরে আসেন নিজেদের ভিটেমাটির টানে।

দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা, পরিচিত মানুষদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতিচারণে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বদলে যায় গ্রামের পরিবেশ। লোকমুখে ‘ভূতের গ্রাম’ নামে পরিচিত এই জনপদে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো তাই কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র ধরে রাখার এক অনন্য উপলক্ষ।কুলটির বেনা গ্রাম একসময় ছিল মানুষের বসবাসে ভরা একটি পরিচিত জনপদ।
বাড়িঘরে চলত সংসার। গ্রামজুড়ে ছিল মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চেনা ছবিতে বদল আসে। বিভিন্ন সমস্যা ও পরিকাঠামোগত অসুবিধার কারণে ধীরে ধীরে গ্রামের বহু পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র বসবাস শুরু করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। নিয়ামতপুর, সীতারামপুর ও কুলটির বিভিন্ন এলাকায় চলে যান বহু বাসিন্দা। একের পর এক পরিবার চলে যাওয়ায় কমতে থাকে গ্রামের জনবসতি।
পরবর্তী সময়ে বহু বাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোথাও ভেঙে যায় দেওয়াল, কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছাদ, আবার কোথাও আগাছায় ঢেকে যায় বাড়ির আশপাশ।একসময়ের বসতিপূর্ণ গ্রাম ধীরে ধীরে পরিণত হয় প্রায় জনশূন্য এলাকায়। পরিত্যক্ত বাড়িঘর, নীরব পরিবেশ এবং গ্রামকে ঘিরে প্রচলিত নানা লোককথার কারণে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে বেনা গ্রামের পরিচিতি তৈরি হয় ‘ভূতের গ্রাম’ হিসেবে। তবে এই নামের আড়ালে রয়েছে একটি জনপদের পরিবর্তিত বাস্তবতা, মানুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার ইতিহাস এবং হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি।
অচেনা সেই বেনা গ্রামের বর্তমান চিত্রের মধ্যে বিশেষভাবে নজর কাড়ে লক্ষ্মীমন্দির। আগে মন্দিরটির চেহারা ছিল অনেকটাই সাধারণ। বর্তমানে সেটিকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মন্দিরের দেওয়ালে নকশাদার টাইলস, দরজা-জানালায় উজ্জ্বল নীল রং এবং সামনের অংশের আকর্ষণীয় সাজসজ্জা মন্দিরটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। উপরের অংশেও দেবদেবীর মূর্তি দিয়ে সাজানো নান্দনিক কাঠামো চোখে পড়ে।মন্দিরের এই পরিবর্তিত রূপ আশপাশের জরাজীর্ণ বাড়িঘরের সঙ্গে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
একদিকে ভগ্নপ্রায় বসতভিটে যেন গ্রামের হারিয়ে যাওয়া অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে নতুন সাজে দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষ্মীমন্দির মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য বহন করে। গ্রামের জনবসতি কমে গেলেও মন্দিরকে ঘিরে যে আবেগ ও শ্রদ্ধা আজও রয়েছে, তার প্রতিফলন দেখা যায় এই নতুন রূপের মন্দিরকে দেখেই ।মন্দিরের পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
একটি গ্রামের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধর্মীয় স্থান কিভাবে সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে, বেনার লক্ষ্মীমন্দির তারই উদাহরণ। আশপাশের বাড়িঘর পরিত্যক্ত হয়ে পড়লেও মন্দিরকে ঘিরে পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে।বেনা গ্রামের লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাক্তন বাসিন্দাদের আবেগ। কোজাগরী পূর্ণিমা এলেই গ্রামের প্রতি টান অনুভব করেন পুরনো বাসিন্দাদের অনেকে।
কর্মসূত্রে কিংবা পরিস্থিতির কারণে অন্যত্র বসবাস শুরু করলেও নিজেদের পুরনো গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁরা পুরোপুরি ছিন্ন করেননি। পুজোর দিন সেই সম্পর্ক আরও একবার সামনে আসে।দেবী লক্ষ্মীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে পুরনো পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হওয়া, অতীতের স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া এবং পূর্বপুরুষের ভিটেমাটির কাছে ফিরে আসার মধ্যে খুঁজে পান অনেকে এক অন্যরকম মানসিক টান।
যে বাড়িতে একসময় শৈশব কেটেছে, যে পথে প্রতিদিন চলাচল ছিল, যে প্রতিবেশীদের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল দীর্ঘদিনের সম্পর্ক—সেই সব স্মৃতি যেন কোজাগরী পুজোর আবহে আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।বছরের অন্য সময়ে গ্রামের নীরবতা চোখে পড়লেও লক্ষ্মীপুজোর সময় সেই পরিচিত জনপদের স্মৃতি নতুন করে ফিরে আসে। পুজোকে কেন্দ্র করে পুরনো বাসিন্দাদের আনাগোনা বেনার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের গভীরতাকেই তুলে ধরে। তাঁদের কাছে এই উৎসব শুধু দেবীর আরাধনা নয়, নিজেদের শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ারও একটি বিশেষ দিন।
বেনা গ্রামের বর্তমান দৃশ্য যেন দুটি ভিন্ন বাস্তবতাকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে সময়ের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত পরিত্যক্ত বাড়িঘর, অন্যদিকে নতুন সাজে সজ্জিত লক্ষ্মীমন্দির। গ্রামের বহু বসতবাড়ি আজ আর স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপযোগী অবস্থায় নেই। কিন্তু মন্দিরের দিকে তাকালে বোঝা যায়, জনবসতি কমে যাওয়া মানেই একটি গ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পূর্ণ মুছে যাওয়া নয়।একটি জনপদের অস্তিত্ব শুধু তার বাড়িঘর, রাস্তা কিংবা জনসংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
সেই অস্তিত্ব বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। বেনার লক্ষ্মীমন্দির সেই অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। মন্দিরের নতুন সাজ যেমন নজর কাড়ে, তেমনই তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের আবেগ এই জনপদের অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে।গ্রামের জনবসতি কমে যাওয়ার পিছনে পরিকাঠামোগত সমস্যা ও জীবনযাত্রার অসুবিধার কথা স্থানীয় সূত্রে উঠে এলেও বেনাগ্রামের ভবিষ্যৎ কি হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
আবার সেখানে স্থায়ী জনবসতি গড়ে উঠবে কি না, কিংবা পরিত্যক্ত বাড়িঘরগুলির ভবিষ্যৎ কি, তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে আপাতত কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোকে ঘিরে যে ঐতিহ্য টিকে রয়েছে, তা গ্রামের পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।কুলটির ‘ভূতের গ্রাম’ বেনার লক্ষ্মীপুজো তাই অন্য অনেক উৎসবের থেকে আলাদা। এখানে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি মিশে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া একটি জনপদের গল্প, পরিত্যক্ত বাড়িঘরের নীরবতা এবং পুরনো ভিটেমাটির প্রতি মানুষের অমোঘ আকর্ষণ।
একসময় যে গ্রামে প্রতিদিন মানুষের কোলাহল শোনা যেত, আজ সেখানে নীরবতাই প্রধান। অথচ কোজাগরী পূর্ণিমায় সেই গ্রামের লক্ষ্মীমন্দিরকে ঘিরে পুরনো সম্পর্ক ও স্মৃতির টান আবার সামনে আসে।ধ্বংসস্তূপের মাঝে নতুন সাজে দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষ্মীমন্দির যেন নীরবে জানিয়ে দেয়, সময় অনেক কিছু বদলে দিতে পারে, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের শিকড় সহজে উপড়ে ফেলা যায় না।
বেনার বাড়িঘর হয়তো আজ অতীতের সাক্ষী, কিন্তু লক্ষ্মীমন্দির এখনও সেই অতীতকে ধরে রেখেছে বর্তমানের সঙ্গে।বলতে গেলে জনবসতি হারিয়েছে বেনাগ্রাম। ভেঙেছে বহু বাড়িঘর, বদলে গেছে গ্রামের চেনা ছবি। তবুও কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীমন্দিরকে ঘিরে ফিরে আসে পুরনো দিনের স্মৃতি। কুলটির এই পরিত্যক্ত জনপদে তাই আজও অটুট রয়েছে বিশ্বাস, ভক্তি এবং নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক চিরন্তন টান।

